সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ, হচ্ছে কনটেন্ট অপসারণে মেটাকে বাধ্য করার বিধান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি, ভিডিও ও অডিও ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করার বিধানও আইনে যুক্ত করা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হেলেন জেরিন খানের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইনে হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। সংগঠিত বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের প্রধান, তাঁর স্ত্রী ও কন্যাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি না, সেটা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।’
সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভার্চ্যুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, ‘আজকে (সোমবার) সকালেই এ বিষয়ে আমি একটা আইনি সংস্কার করার জন্য ড্রাফটে হাত দিয়েছি। আমি জানতাম না আজকে এই প্রশ্নটা এখানে আসবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, অপমানকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নামে আমরা অবহিত করব। এর কতিপয় বিধান সংশোধন করব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুজব, অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্ট নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে। এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধানও আইনে যুক্ত করা হবে।
মেটাকে বাধ্য করার বিধান
হেলেন জেরিন খান সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান, মেটাসহ আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আইনে এখনো এমন কোনো বিধান নেই, যার মাধ্যমে মেটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে তারা আইনি সুরক্ষার মাধ্যমে এমন বিধান করেছে, মেটাকে ২৪ ঘণ্টায় অ্যাকশন নিতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমাদের বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার আইনে সেই বিধানটা নাই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিটিআরসি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ মেটাকে অনুরোধ পাঠালেও তারা অনেক সময় দ্রুত ব্যবস্থা নেয় না। তারা বলে, তোমাদের তো আইনটা ঠিকমতো নেই। সুতরাং আইনি কভার না থাকলে সেটা প্রেশার (চাপ) দেওয়া যায় না।
মন্ত্রী জানান, নতুন সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়, সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ এবং রিপোর্ট করা কনটেন্ট সরানোর প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার বিধান রাখা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সাইবার সুরক্ষা সংস্থা, বিটিআরসি এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও এ ধরনের কনটেন্ট অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের ক্ষমতা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
জুয়া ও মাদক আইনে আসছে পরিবর্তন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুয়া প্রতিরোধে এখনো ১৮৬৭ সালের আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় অনলাইন জুয়া, অফলাইন জুয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ফাইনাল স্টেজে (চূড়ান্ত ধাপে) আছে। আশা করছি, সংসদের এই সেশনে আইনটা আনতে পারব।’
মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংশোধনী আনার কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং ডগ স্কোয়াড নেই। অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্গানাইজেশন করার জন্য আইনি প্রস্তাবগুলো আনা হবে।