বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ধর্মীয়ভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটহীন খণ্ডিত বক্তব্যের ভিডিও

এ বছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর হার বেড়েছে বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাবপ্রতীকী ছবি: রয়টার্স

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীদের বক্তব্য খণ্ডিত করে ধর্মীয় আঙ্গিকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপনের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওর ক্যাপশনেই বক্তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। মন্তব্যে অন্য ব্যবহারকারীরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। সেখানে উঠে আসছে বক্তাদের বিরুদ্ধে ‘নাস্তিক’, ‘কাফির’, ‘মুরতাদ’, ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’র মতো বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্য। সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া এমন পাঁচটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য জানিয়েছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনসাধারণের আবেগ প্রভাবিত করার শক্তিশালী মাধ্যম ধর্ম। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করা গেলে তা দ্রুত বড় ধরনের বিতর্কে পরিণত হয়। আর নির্বাচনের সময় এই কৌশল ব্যবহার করে বিভিন্ন পক্ষ।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও এসব ভিডিও ছড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমেও এ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ছে।

ডিসমিসল্যাব তাদের বিশ্লেষণে ব্যবহার করা পাঁচটি ভিডিওর মধ্যে দুটি যাচাই কের দেখেছে, একটিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল বলছেন, ‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজনমতো এসে বায়তুল মোকাররমে পূজা দিতে পারবে…’। এই ভিডিও ক্লিপটির এই ১০ সেকেন্ডই ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ১২ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী পাপিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘শরীরের জন্য তামাক বড়ই ক্ষতিকর, আর ধর্মের জন্য ইসলাম বড়ই ক্ষতিকর’।

দুটি ভিডিওতেই বক্তব্য বিকৃত বা প্রযুক্তিগতভাবে কোনো পরিবর্তন (ডিপফেক) করা হয়নি। তবে মূল ভিডিওর পূর্ণ বক্তব্যের এমন অংশ বেছে নেওয়া হয়েছে, যেন বক্তব্যের অর্থ ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো বক্তব্য বাস্তব হলেও তা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করার কৌশল হলো ‘ডিকনটেক্সচুয়ালাইজেশন’ বা প্রেক্ষাপট বিচ্ছিন্নকরণ। এতে বক্তব্যের অর্থ ও উদ্দেশ্য বদলে যায়।

নির্বাচনের আগে এ ধরনের ভিডিও ছড়ানোয় শুধু প্রার্থীদের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, একই সঙ্গে ভোটারদের সঙ্গেও প্রতারণা করা হচ্ছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সুমন রহমান। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনভাবে ভোট দান করাটা একজন ভোটারের অধিকার। আমি ভালোভাবে জেনে ভোট দেব। আপনি যখন আমাকে ভুল তথ্য দিচ্ছেন, তখন আমি একজন প্রার্থীকে সেই ভিত্তিতে খারাপ জানলাম। তখন এটা আমার ভোটকে প্রভাবিত করবে।’

সুমন রহমান বলেন, ‘শুধু নির্বাচনের আগে না, এটা সব সময় ছড়ায়। ভুল তথ্য, অপতথ্য ছড়ানোর বড় টেকনিক ডিকনটেক্সচুয়ালাইজ করা। অর্থাৎ যে কথাটা বলা হচ্ছে বা কোট করা হচ্ছে বা ক্লেইম করা হচ্ছে এটা সত্য, কিন্তু এটা আসলে অন্য পরিপ্রেক্ষিতে অন্যভাবে বলা হয়েছিল। যখন এটাকে কেটে ফেলা হয়, তখন এটার পরিপ্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়ে যায়, অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়।’ বর্তমানে প্রোপাগান্ডা ওয়ারফেয়ার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় এখন প্রার্থীদের জনসভার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি মুভমেন্ট নোট করা হচ্ছে, রেকর্ড করা হচ্ছে। খুব ভালো পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট করা হচ্ছে নির্বাচনকালীন প্রচারণায়। এখন যেহেতু নির্বাচনের কিছুদিন আছে, প্রচারকারীরা যেনতেন প্রকারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে।’