রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগাতে হবে

‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহি, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক সেমিনারে আলোচকেরা। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলেছবি প্রথম আলো

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কেবল কমিটি গঠন নয়, প্রত্যাবাসনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। এই প্রত্যাবাসনে ভারত, চীনসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে কাজে লাগাতে হবে।

‘রোহিঙ্গা গণহত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ: জবাবদিহি, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রত্যয়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন আলোচকেরা। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই সেমিনারের আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।

ক্যাম্প পরিদর্শন ও রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সেমিনারে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, প্রত্যাবাসনের বিষয়ে রোহিঙ্গাদের আগ্রহ রয়েছে। বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যে কমিটি করেছে, তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন কমিটি ও কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। তাই এই কমিটির কাজেরও নিয়মিত অনুসরণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে দেখার জন্য একটি ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি’ গঠনেরও প্রস্তাব দেন তিনি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ফজলে এলাহী আকবর বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকটকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভারতের কালাদান প্রকল্পের নিরাপত্তা ও বাস্তবায়ন রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ বিষয়টি কাজে লাগিয়ে ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরও সক্রিয় করা সম্ভব। একইভাবে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উদ্যোগও বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

গুম প্রসঙ্গে সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা বলেন, আইনবহির্ভূত নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করা একজন সৈনিকের দায়িত্ব হলেও বিগত সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর কিছু সদস্য গুমের ঘটনায় জড়িত হয়েছেন, যা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তাঁকে বিব্রত করে। রাষ্ট্রে জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজনৈতিক ঐকমত্য জরুরি

বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, বর্তমানে মিয়ানমারের ভূখণ্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত এবং আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারকে ঘিরে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর স্বার্থ রয়েছে। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে আলোচনা করে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক বা দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে দেখলে এর সমাধান হবে না; এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি জড়িয়ে গেছে। মিয়ানমারের গুরুত্ব এখন বেড়েছে, বিশেষ করে মালাক্কা প্রণালির বিকল্প জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামো, গ্যাস পাইপলাইন ও বন্দর ঘিরে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের স্বার্থ তৈরি হয়েছে। তাই বাংলাদেশের এখন একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার, যার মূল লক্ষ্য হবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছাড়া প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের জন্য যে নতুন কাঠামো করা হয়েছে, সেটিকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাহাব এনাম খান আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের রাখার কথা না বলে তাদের প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে সংকটটিকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। ক্যাম্পে অস্ত্র, মাদক, মানব পাচার ও সংঘাত বিস্তার ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও মানব পাচার বন্ধ করা গেলে রোহিঙ্গাদের ঘিরে গড়ে ওঠা সংঘাতের অর্থনীতিও দুর্বল হবে।

আরও পড়ুন

অভিযুক্ত বাহিনীকে গুমের তদন্ত থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব

গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার ওপর জোর দিয়ে গুমের শিকার বিএনপির বর্তমান সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী গুমের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, সেই বিভাগ, সংস্থা বা বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। কোনো ঘটনায় একাধিক বাহিনী বা সংস্থা জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের আইনের আওতায় কমিশন নিজস্ব কমিটি গঠন করে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে।

নিজের গুমের ঘটনা তুলে ধরে হুম্মাম কাদের বলেন, তাঁকে প্রথমে ডিবি তুলে নিয়ে যায় এবং পরে ডিজিএফআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়; ফলে তদন্তের ক্ষেত্রে একাধিক সংস্থার সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, গুমের ঘটনায় শুধু সরাসরি জড়িত ব্যক্তিই নয়, আদেশদাতা ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র আওতায় থাকা কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে। গুমের বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্তকে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবমুক্ত রেখে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের চিহ্নিত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

আরও পড়ুন

‘গুমের সংস্কৃতি’ বাংলাদেশে আর ফিরে আসতে দেওয়া উচিত নয় বলে সেমিনারে উল্লেখ করেন এবি পার্টির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ওহাব মিনার। একই সঙ্গে গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যে বিচারপ্রক্রিয়া চলছে, তা যেন কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সামনে প্রত্যাবাসন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন ও বাংলাদেশে তাদের শোষণ—এই তিনটি পথ খোলা আছে। তবে কোন পথ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়া জরুরি। একইভাবে, গুমের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্বাধীন ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থা প্রয়োজন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া।

আরও পড়ুন