‘দঙ্গলবাজিকে’ উৎসাহিত করা হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকবে না

‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার: স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়’ শীর্ষক নীতি সংলাপে সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

দঙ্গলবাজিকে উৎসাহিত করা হলে, পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে চিন্তার আর অবকাশ থাকবে না বলে সতর্ক করেছেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল কেউ কেউ ‘মব’কে ‘মব’ বলতে নিষেধ করেছেন। তাই ‘মব’কে ‘মব’ না বলে দঙ্গলবাজ বলা যায়। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার: স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়’ শীর্ষক নীতি সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই সংলাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমবিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা অংশ নেন।

সংলাপে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেউ কখনো মুখে তুলে দেবে না। তাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণমাধ্যমকর্মীদেরই আদায় করতে হবে। আদায় করার কথা বলে যেতে হবে। আগামী সরকারের প্রতি প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, শুধু সরকারি দলই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হবে তা নয়, বিরোধী দলও হতে পারে। অতীতে তা দেখা গেছে।

ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক–অরাজনৈতিক যেকোনো গোষ্ঠী, বাণিজ্যিক–অবাণিজ্যিক যেকোনো গোষ্ঠী—প্রত্যেকের কাছ থেকেই গণমাধ্যম হুমকির মুখে। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হুমকির মুখে। এর বিরুদ্ধে দরকার পেশার ঐক্য, যেটি নেই। নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘবদ্ধ সহিংসতা

সংলাপে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আসে একাধিকবার। সংলাপে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরও ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর। তিনি মনে করেন, ওই হামলা মব নয়, বরং সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত সহিংসতা।

নূরুল কবীর বলেন, ‘আগের থেকে হুমকি আসছে, দূর থেকে অর্গানাইজ (সংগঠিত) করা হচ্ছে, বিপদের সময় সরকার কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না এবং একটা অফিসের মধ্যে সাংবাদিকদের আটকে রেখে চার দিকে আগুন দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস আসতে পারছে না। সেটাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।…ইটস অ্যান অর্গানাইজড ভায়োলেন্স (এটা একটা সংঘবদ্ধ সহিংসতা)।’

নূরুল কবীরের মতে, এই সুশৃঙ্খল হামলা অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো অংশ বা গোটা সরকার হতে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘…একটা দেশের মধ্যে প্রধান প্রধান পত্রিকা অফিসে যখন সংঘবদ্ধ আক্রমণ হয়, তখন যদি সরকারের প্রেস সেক্রেটারি সরকারের কাউকে খুঁজে না পান, সাহায্যের জন্য যদি কেউ এগিয়ে না আসে, তার মানে হচ্ছে এই সরকারের লোকেরা এটাকে হতে দিয়েছে।’

‘বাংলাদেশে গণমাধ্যম সংস্কার: স্বাধীনতা, দায়িত্ব ও ক্ষমতার সমন্বয়’ শীর্ষক নীতি সংলাপে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

আত্মসমালোচনা

সিজিএসের সংলাপে স্বাধীন গণমাধ্যম, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, গণমাধ্যমকে আত্মসমালোচনা করতে হবে। এর সঙ্গে বিগত বছরগুলোর ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাগুলো মূল্যায়ন করা জরুরি। তবেই ভবিষ্যতে স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা সহজ হবে।

অধ্যাপক শামীম রেজা মনে করেন, গণমাধ্যম আন্দোলনে জনগণের সম্পৃক্ততা কম। তাই গণমাধ্যম ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সাংবাদিকদের বেতনকাঠামো, সুরক্ষা আইন, প্রেস কাউন্সিলের কার্যকারিতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দমনমূলক আইনি বিষয়গুলো দূর করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত করাতে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান তিনি।

তোষামোদি সাংবাদিকতা

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সাংবাদিকদের নামে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক সংকটের যথাযথ সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মধ্যে সরকারকে তোষামোদ করার একটি প্রবণতা রয়েছে, যা বিগত সরকারের সময় ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। সুষ্ঠু ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, স্বল্প সময় ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও গণমাধ্যমবিষয়ক সংস্কার কমিশন যে কাজটি সম্পন্ন করেছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান সরকার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আগামীতে যারা সরকারে আসবে, তারা গণমাধ্যম সংস্কারে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে।

নারীর অংশগ্রহণ

বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে হলে গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রথম আলোর ইংরেজি ওয়েব বিভাগের প্রধান আয়েশা কবির। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ ও অধিকারের আলোচনা যদি নারী সাংবাদিকদের বদলে পুরুষ সহকর্মীদের কাছ থেকেও উঠে আসে, তবে গণমাধ্যমে নারীদের জন্য কাজের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাজেদুল হক রুবেল, বিএনপির থিঙ্কট্যাংক জি-৯-এর সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন, চ্যানেল আই–এর প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ কে এম মনজুরুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জায়মা ইসলাম প্রমুখ। সংলাপটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।