নির্বাচন কি ২০১৪ সালের মতো হবে, প্রশ্ন জাপার

একতরফা নির্বাচন হলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারকে দ্রুত সংলাপ ডাকার আহ্বান জাতীয় পার্টির।

জাতীয় সংসদ ভবন
ফাইল ছবি

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো হবে কি না, সে প্রশ্ন সংসদে তুলেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বলছে যথাসময়ে নির্বাচন। কীভাবে হবে? ২০১৪ সালের মতো? এর কী জবাব?
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে একটি বিল পাসের আলোচনায় এসব প্রশ্ন তোলেন জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহমদ।

আজ গোটা দেশ অশান্ত—এমনটি উল্লেখ করে জাপার সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহমদ বলেন, অবরোধে (বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ও জোটের ডাকা তিন দিনের অবরোধের প্রথম দিন ছিল গতকাল) বিভিন্ন জায়গায় মারামারি হচ্ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগের যে পরিস্থিতি ছিল, দেশ সেদিকে যাচ্ছে। এর সুষ্ঠু সমাধান জরুরি। পোশাকশ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছেন।

বিল পাসের (পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাসমূহ বলবৎকরণ) আলোচনায় হাফিজ উদ্দীন আহমদ সরকারকে নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং শ্রমিকদের দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ারও আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ বেশির ভাগ দল বর্জন করেছিল। একতরফা ওই নির্বাচনে সংসদে ১৫৩ আসনে ভোটের প্রয়োজনই হয়নি।

অবশ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছিল জাতীয় পার্টি। মন্ত্রিসভার ভাগও পেয়েছিল দলটি। তখনো বিএনপিসহ অন্য দলগুলো নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছিল। অবশ্য পরে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই অংশ নিয়েছে বিএনপি। যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে দেশ–বিদেশে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দিনের ভোট রাতে হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল।

গতকাল সংসদে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশের পাশাপাশি সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে জাপা। একতরফা নির্বাচন হলে সামনে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে দলটির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী সরকারকে দ্রুত সংলাপ ডাকার আহ্বান জানান।

শামীম হায়দার যখন সংসদে সংলাপ ডাকার আহ্বান জানাচ্ছেন, এর অল্প কিছু সময় আগে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভোট সামনে রেখে অনেক ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে উল্লেখ করে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, গার্মেন্টসে আন্দোলন হচ্ছে। বিএনপিও আন্দোলন করছে, সেখানেও মারামারি হচ্ছে। সংঘাত দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি বলেন, আজ সংঘাত আছে, জনমনে আতঙ্ক আছে। যেহেতু ড্রাইভিং হুইলে আছে সরকার, যেহেতু সরকার ক্ষমতায় আছে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, সমাধানের ক্ষমতা সরকারের হাতে, সরকারের এ বিষয়ে ডায়ালগ থাকা উচিত। আলোচনা করা উচিত।

জাপার এই সংসদ সদস্য বলেন, রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একতরফা নির্বাচন হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে এলসি (ঋণপত্র খোলা) কমবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপ ডাকার আহ্বান জানিয়ে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেছেন, ‘রাষ্ট্র–সরকার তো এক দিনের জন্য না। একটা ভোটের জন্য না। দীর্ঘদিনের জন্য। আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকন্যার এখন একটি হাই টাইম ডায়ালগ ডাকার, শান্তি প্রতিষ্ঠা করার এবং একটা সুষ্ঠু সমাধানের দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়ার।’
সদুত্তর পাওয়া যায় না

বেতন বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে গতকাল সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, পুলিশের গুলিতে নিহত শ্রমিক শুধু বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় রাস্তায় নেমেছিলেন। তাঁদের গুলি করে মারা হলো।

আরেকটি বিলের (সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সংশোধন বিল) আলোচনায় কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে রোগী গেলে চিকিৎসকেরা ‘সিট নেই’ বলে বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সরকারের বড় পদে থাকলে সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে চলে যাওয়া যায় (চিকিৎসার জন্য) সরকারি খরচে। কিন্তু সাধারণ লোকেরা যাবেন কোথায়?

জাপার এই সংসদ সদস্য বলেন, এত বিল পাস করে হবে কী? কোথাও জবাবদিহি নেই। কারও কাছ থেকে সদুত্তর পাওয়া যায় না। শুধুই সংসদে আলোচনায় কোনো কাজ হয় না।

কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, কুমিল্লা থেকে এক বাবা স্কুটার চালিয়ে শিশুকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। শিশুটির অক্সিজেনের অভাব ছিল। এই হাসপাতালে যায়, বলে অক্সিজেন নেই। ওই হাসপাতালে যান, দেখেন নেই (অক্সিজেনের ব্যবস্থা)। শিশু হাসপাতালে বলে সিট (শয্যা) নেই। বাইরে থেকে এক আনসার তাঁকে বলে দিলেন, ওই হাসপাতালে যান। পরে শিশুটি মারা গেল। সাংবাদিক গিয়ে দেখল, আটটি সিট খালি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আজ পর্যন্ত কি কোনো ডাক্তারকে বদলি করতে পেরেছেন? পারবেন না। কারণ, ওখানেও সব আওয়ামী লীগ ঢুকে গেছে। ডাক্তারদের মধ্যেও আওয়ামী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ।’

‘গরিবকে তো কেউ টাকা দেয় না’

পেশাজীবীদের মধ্যে দলীয়করণ প্রসঙ্গে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‌‘হায়রে স্বাধীনতা, কী চমৎকার একটা শব্দ! নামের আগে স্বাধীনতা লাগিয়ে দিলে এই দেশে আর কোথাও কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। শুধু লিখবেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, স্বাধীনতা হকার্স পরিষদ, স্বাধীনতার সংসদ হয়ে গেল।’

জেলা পর্যায়ে কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা হয় না অভিযোগ করে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে তো লাখ লাখ টাকা লাগে। আমাদের মহামান্য তো এখন সিঙ্গাপুরে আছেন। দেড়-দুই কোটি টাকা বিল আসবে মহামান্যের।

দুই দিন আগে মহামান্য হওয়ার আগে উনি দুই টাকাও পাইতেন না। আল্লাহ বানায়ে দিছেন, উনি এখন যত টাকা লাগুক, তিনবার বুক ফাড়লেও উনি টাকা পাবেন। কিন্তু গরিবকে তো কেউ টাকা দেয় না।’