ডায়াবেটিসের ডিজিটাল গাইড বই

সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চের প্রকল্প পরিচালক চিকিৎসক বিশ্বজিৎ ভৌমিক প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের অ্যাপ প্রথম প্রয়োগ হয় ফিনল্যান্ডে। দেশে এই প্রথম হচ্ছে। টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৬০ শতাংশ রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না।

অনেকের ১০-১৫ বছর ডায়াবেটিস নীরব অবস্থায় থাকে। এই অ্যাপের মাধ্যমে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নির্ণয় হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি র‌্যানডম পরীক্ষার পর সেই তথ্য অ্যাপে দিয়ে জানতে পারবেন তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কি না এবং আক্রান্ত হলে কোথায় গিয়ে সেবা নিতে পারবেন। তিনি যেসব সেবাকেন্দ্রে সেবা নেবেন, সেই সব কেন্দ্র থেকে তাঁর তথ্য চিকিৎসকেরা অ্যাপে যুক্ত করে দেবেন। ফলে অ্যাপটি হবে ওই ব্যক্তির ‘ডিজিটাল গাইড বই’। এর মাধ্যমে কত মানুষ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে, কতজন আক্রান্ত, কতজন চিকিৎসা পাচ্ছেন, কত সংখ্যকের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কত সংখ্যকের অন্য জটিলতা দেখা দিয়েছে, সে সম্পর্কে তথ্য থাকবে। ফলে অ্যাপটি ডায়াবেটিস নজরদারির পদ্ধতি তৈরিতেও সহায়তা করবে।

অ্যাপটি এ বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে পৃথকভাবে ১৬টি শহর ও ৮টি উপজেলার ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী ১৬ হাজার নারী-পুরুষের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের মধ্যে শহরের ৫০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ৪০ শতাংশ মানুষ জানতেন না তাঁদের ডায়াবেটিস আছে। তবে অ্যাপটি ইতিমধ্যে ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

অ্যাপে যা যা আছে

অ্যাপটিতে ক্লিক করলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য নিবন্ধন করার ছক আসবে। ছকে নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, পেশা, বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ই-মেইল ঠিকানা দিয়ে নিবন্ধন করা যাবে। লগইন করা যাবে ফোন নম্বর দিয়ে। নিবন্ধনকারীর বয়স, উচ্চতা, ওজন, কোমর ও নিতম্বের মাপ এবং রক্তচাপের তথ্য জানানোর পর তাঁর বডি ম্যাস ইনডেক্স (বিএমআই) জানিয়ে তিনি ঝুঁকিতে আছেন কি না, সেই তথ্য দেবে অ্যাপ। মোট ২২ ধরনের তথ্য জমা থাকবে অ্যাপে। এই অ্যাপে বলা হয়েছে, শূন্য থেকে ৪ স্কোরের অর্থ ডায়াবেটিসের কম ঝুঁকিতে রয়েছেন নিবন্ধনকারী, ৫ থেকে ৯ মাঝারি ঝুঁকি এবং ৯-এর ওপরে উচ্চ ঝুঁকি।

রাজধানীর শাহবাগে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে প্রথম আলো প্রতিবেদকের সামনে ১৫ নভেম্বর শাহাদত হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী অ্যাপে নিবন্ধন করে তাঁর ডায়াবেটিস ঝুঁকি আছে কি না দেখে নেন। ৫৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির স্কোর আসে ৮, যা মাঝারি ঝুঁকি। ওই ব্যক্তি জানান, তিনি ডায়াবেটিসের র‌্যানডম টেস্ট (আঙুলে সুচ ফুটিয়ে রক্ত নিয়ে যন্ত্রে দেওয়া) করেছেন আগে। তাঁর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এসেছিল প্রতি লিটারে ৫ মিলিমোল।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কোনো নারী-পুরুষের সাধারণত খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ৭ মিলিমোল/লিটার এবং গ্লুকোজ খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর ১১.১ মিলোমোল/লিটার এলে ডায়াবেটিস আছে বলে ধরা হয়।

নিবন্ধনকারী ওই ব্যক্তির বিষয়ে চিকিৎসক বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, ওই ব্যক্তির ডায়াবেটিস নেই। তবে তিনি ঝুঁকিতে আছেন। ডায়াবেটিস যেন না হয়, সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাঁকে অ্যাপে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অ্যাপে আরও বলে দেওয়া হয়, নিবন্ধনকারীর ওজন কত হওয়া উচিত এবং সেই অনুপাতে তাঁকে দিনে কত ক্যালরি খাবার খেতে হবে। অ্যাপে বিনা মূল্যে নিবন্ধনকারীর উপযোগী সুষম খাবার বা ডায়েট ও ব্যায়ামের পরিকল্পনা, ডায়াবেটিস সচেতনতা বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবার ভিডিও এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের ‘মুক্তপাঠ’-এর মাধ্যমে অনলাইনে কোর্স করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষ ডায়েট পেতে এবং বিভিন্ন রোগ ও অবস্থায় খাদ্য পরামর্শবিষয়ক অনলাইন বইটি পড়তে ২৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।  

অ্যাপটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখবে

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) ২০২১ সালের তথ্য অনুসারে, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৩১ লাখ ডায়াবেটিস আক্রান্ত। সারা দেশে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ১০৯টি শাখায় নিবন্ধিত ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ।

গত বছর ‘বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে অসংক্রামক রোগ’ শিরোনামে ১০ জেলায় ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২ হাজার ৪৬৮ জনের ওপর একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালিয়েছিল সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ। ওই গবেষণায় ২০ বছরের নিচে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৪ জনের বেশি ছেলেমেয়ের ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। নতুন শনাক্ত হওয়া ৬১ শতাংশের ডায়াবেটিসের কোনো উপসর্গ ছিল না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টরের অধ্যাপক মোহাম্মদ রোবেদ আমিন প্রথম আলোকে বলেন, এখন লোকজনের হাতে হাতে স্মার্টফোন। ফলে খুব সহজেই একজন মানুষ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির বিষয়ে জেনে ব্যবস্থা নিতে পারবেন। ফলে অ্যাপটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। ৪০ বছর বয়স হলে নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হয়। তবে উপসর্গ থাকে না বলে অনেকে পরীক্ষা করান না।

অধ্যাপক মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না রাখলে স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, চোখ ও কিডনিতে সমস্যা হতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে একজন ব্যক্তির সরাসরি মৃত্যু হতে পারে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। মিষ্টি-জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। পরিমিত আহার ও কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করতে হবে।