২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭। বেলা সাড়ে ১১টায় কর্তৃপক্ষের অসম্মতি উপেক্ষা করেই তৎকালীন ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে সশস্ত্র বামপন্থী সংগঠন ‘জাপানিজ রেড আর্মির’ ছিনতাই করা জাপান এয়ারলাইনসের ডিসি-৮ মডেলের যাত্রীবাহী বিমান।
এরপর ছিনতাইকারীদের ৬০ লাখ ডলারের মুক্তিপণসহ দুই দাবি নিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলে ১০৫ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। বাংলাদেশের মধ্যস্থতায় ছিনতাইকারীদের দাবি পূরণের মাধ্যমে সেই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিল বিমানে থাকা ১৫১ জন মানুষের প্রাণ।
ভারতের বোম্বাই (বর্তমানে মুম্বাই) বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট নম্বর ৪৭২-এর ডিসি-৮ বিমানটি প্যারিস থেকে মুম্বাই হয়ে ব্যাংককে যাচ্ছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ সময় ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে উড্ডয়নের ১৩ মিনিট পরই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারীরা বিমানটিকে প্রথমে ভারতের কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকৃতি জানালে তারা বিমানটিকে ঢাকার আকাশে নিয়ে আসে। বিমানটি ঢাকার আকাশে প্রায় ৪০ মিনিট ধরে চক্কর খায়। ঢাকা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমান অবতরণে অস্বীকৃতি জানালে তারা সরাসরি জানায়, তাদের আর কোনো পথ নেই, তাই এখানেই অবতরণ করবে।
ঘটনাটি ছিল কোনো ছিনতাই করা বিমানের প্রথম ঢাকায় অবতরণ। বিমানটি ঢাকায় অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ঢাকা বিমানবন্দর বন্ধ করে ছিনতাই করা বিমানের আশপাশে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর কয়েক শ সেনা মোতায়েন করে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছিনতাইকারীরা হুমকি দেয়, বিমানের ২০০ গজের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের গুলি করে হত্যা করা হবে, বিমানটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিমানের ইঞ্জিন স্টার্টারের ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ চার্জ করা, বিমানের এয়ারকন্ডিশনার চালানোর জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এবং খাবার ও পানীয় পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানায় তারা।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর তৎকালীন প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন বেলা দেড়টা থেকে। সেই আলোচনার সবকিছু ঢাকার জাপান দূতাবাসের মাধ্যমে টোকিওতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানিয়ে দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়। ছিনতাইকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে ৬০ লাখ মার্কিন ডলার এবং জাপানের কারাগারে আটক তাদের ৯ জন ‘সহযোদ্ধার’ মুক্তি দাবি করে। এ ব্যাপারে জাপান সরকারের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার জন্য তারা বাংলাদেশকে অনুরোধ জানায়।
নাটকীয়তা, ছিনতাইকারীদের দুই দাবি
সেই সময়ের পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, ৬০ লাখ ডলার মুক্তিপণ ও ৯ ‘সহযোদ্ধার’ মুক্তি—এ দুই দাবি মানতে প্রথমে ২৮ সেপ্টেম্বর (১৯৭৭) রাত ১২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল ‘জাপানিজ রেড আর্মির’ ছিনতাইকারীরা। বাংলাদেশের মাধ্যমে জাপান সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছিল। পরে ছিনতাইকারীরা আরও তিন ঘণ্টা সময় বাড়ায়। আলোচনার এক পর্যায়ে দাবি মানার জন্য ১ অক্টোবর ভোররাত ৪টা পর্যন্ত এবং পরে একই দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আলটিমেটাম দেয়। সন্ধ্যা ছয়টার পর আর সময় বাড়ানো হবে না বলেও তারা হুমকি দেয়। তারা বারবার বলছিল, জাপান সরকার যদি সময়সীমা লঙ্ঘন করে, তাহলে জিম্মিদের মেরে ফেলা হবে।
২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল, ‘ছিনতাইকারীদের ৯ জন সহযোদ্ধার মুক্তি ও ৬০ লক্ষ ডলারের দাবী পূরণ’। সেখানে বলা হয়েছিল, ‘জাপান সরকার চার ঘণ্টার ব্যবধানে ছিনতাইকারীদের ৬০ লাখ ডলারের দাবী ও পরে নীতিগতভাবে তাহাদের ৯ জন সহযোদ্ধাকে মুক্তিদানের দাবি অদ্য ভোরে মানিয়া লইয়াছেন। তবে বন্দীমুক্তির প্রশ্নে আলোচনায় কিছুটা দেরী হইবে। এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ ছিনতাইকারীদের এ তথ্য জানাইয়াছেন। রাত্রি ৩টায় ছিনতাইকারীরা ১২ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি বিবৃতি পাঠ করে। বিবৃতিতে “জাপানি সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এবং বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের” নিন্দা করিয়া ঘোষণা করা হয়, তাহাদের বন্দী বন্ধুদের মুক্তিদান না করা হইলে বিমান যাত্রীদের মধ্য হইতে প্রেসিডেন্ট কার্টারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যাঙ্কার মার্কিন ইহুদী জন গ্যাব্রিয়েলকে ভোর পাঁচটায় হত্যা করা হইবে। তখনো তাহাদের ৯ জন সহযোদ্ধাকে মুক্তিদানের প্রশ্ন টোকিওতে বিবেচনা করা হইতেছিল। তবে ছিনতাইকারীরা মুক্তিপণ কীভাবে গ্রহণ করিবে, তাহা জানায় নাই।’
১ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ছিনতাইকারীরা বিমানটি নিয়ে রানওয়ে দিয়ে উত্তর দিকে এগোতে থাকে এবং বিমানটি ‘ব্লো–আপ’–এর (বিস্ফোরণের মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়া) হুমকি দেয়। ঢাকা বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ছিনতাইকারীদের বিমানটি ‘ব্লো-আপ’ না করার অনুরোধ এবং রানওয়েতে ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে মতৈক্যে পৌঁছালে ছিনতাইকারীরা বিমানটিকে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দক্ষিণ দিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরপর দফায় দফায় আলোচনায় জিম্মি ও মুক্তিপণ বিনিময়ে উভয় পক্ষ মতৈক্যে পৌঁছায়। ১ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে বিনিময় শুরু হয়। এটি সম্পন্ন হয় ছয় দফায়।
এর মধ্যে ২৯ সেপ্টেম্বর সকালে ছিনতাই বিমানের প্রত্যেক আরোহীর জন্য একটি লাঞ্চ বাক্স পৌঁছে দেওয়া হয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। দেওয়া হয় পানিও। কিন্তু ছিনতাইকারীরা সেই খাবার খায়নি। তারা বিমানে চড়ে আসার সময় যে বিস্কুট নিয়ে এসেছিল, শুধু তা-ই খেয়ে ক্ষুধা মেটায়।
ঢাকায় জাপানি প্রতিনিধিদল
বাংলাদেশ সরকারের নীতি ছিল, রক্তপাত এড়িয়ে নিজের হাতে জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাটির নিষ্পত্তি করা। একপর্যায়ে জাপান থেকে সন্ত্রাস দমনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী পাঠানোর জন্য জাপান সরকার বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এর মধ্যে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে ১ অক্টোবর ঢাকায় এসেছিল ৩৯ সদস্যের একটি জাপানি সরকারি প্রতিনিধিদল এবং জাপান এয়ারলাইনসের ২৯ সদস্যের আরেকটি প্রতিনিধিদল। সরকারি দলটির নেতৃত্বে ছিলেন জাপানের তৎকালীন পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিই। পরে তিনি এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন। ২০১৮ সালে ‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ নামে বইটির বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।
হাজিমে ইশিই যে বিমানে এসেছিলেন, সেখানে ছিল ছিনতাইকারীদের দাবি করা মুক্তিপণের ৬০ লাখ ডলার (তিন বস্তায় ভরা) এবং তাদের ৯ জন ‘সহযোদ্ধার’ মধ্যে ৬ জন ছিলেন। বাকি তিনজন ঢাকায় এসে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগ দিতে রাজি হননি।
জাপানের সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী তাঁর বইয়ে লিখেছেন, জাপান সরকারের প্রতিনিধিদল ঢাকায় যাচ্ছে—এ খবর পেয়েই ছিনতাইকারীরা আলোচনায় আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন এ জি মাহমুদের (তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান) সঙ্গে তাদের যোগাযোগের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে থাকে। হাজিমে ইশিইর সঙ্গে যখন এ জি মাহমুদের প্রথম দেখা ও পরিচয় হয়, তখন তিনি কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন।
হাজিমে ইশিইর উপস্থিতিতে এ জি মাহমুদ ছিনতাইকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাদের মধ্যে ৫২-৫৩ জন জিম্মিকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু এ জি মাহমুদ আরও বেশিসংখ্যক যাত্রীকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে থাকেন। কিন্তু ছিনতাইকারীরা কিছুতেই এ ব্যাপারে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৮২ জনকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়।
একপর্যায়ে হাজিমে ইশিই নিজেই মাইক্রোফোন নিয়ে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। জাপানি ভাষায় তিনি ছিনতাইকারীদের সব যাত্রীর বিনিময়ে তাঁকে জিম্মি হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁর সেই প্রস্তাব ছিনতাইকারীরা গ্রহণ করেনি। বরং বিমানটি নিয়ে রানওয়ের মাঝামাঝি জায়গায় চলে যায়। তখন বাধা দেওয়া হলে ককপিটের জানালা খুলে একজন ছিনতাইকারী পিস্তল বের করে চারটি গুলি ছোড়ে। গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুজন সৈনিক আহত হন।
পরে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু হলে তারা বিমানটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। জিম্মি হওয়া যাত্রীদের মুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে দুই পক্ষে আলোচনা শুরু হয়। ওই রাতে (১ অক্টোবর) জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাকেও ফুকুদার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান ফুকুদাকে এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন।
আলোচনার মাধ্যমে ১ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে ছিনতাইকারীদের একজন ‘সহযোদ্ধা’ ও ২০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ১০ জন নারী যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়। মুক্তিপণের টাকা ও ছিনতাইকারীদের ‘সহযোদ্ধাদের’ তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ। টাকা ও ‘সহযোদ্ধাদের’ বুঝে নিয়ে কয়েক দফায় ৬১ জন যাত্রীকে মুক্তি দেয় ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইয়ের ঘটনা শুরুর ৯০ ঘণ্টা পরও ৭১ জন যাত্রী ও বিমানের ৯ জন ক্রু ছিনতাইকারীদের কাছে জিম্মি থেকে গিয়েছিলেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামরিক অভ্যুত্থান
ঢাকা বিমানবন্দরে যখন এই নাটকীয় পরিস্থিতি চলছে, তখন ২ অক্টোবর ভোরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ওই অভ্যুত্থানে সম্মুখভাগে ছিলেন বিমানবাহিনীর সৈনিকেরা। এর দুই দিন আগে বগুড়া সেনানিবাসে ২২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে সংঘটিত হয়েছিল আরেকটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান।
জাপানের তৎকালীন পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিইর বইয়ে ২ অক্টোবরের সেই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, ‘পরিস্থিতি এমন উত্তেজনাপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও আমরা বুঝতে পারিনি যে একই ভবনের (ঢাকা বিমানবন্দর) ভেতরে হত্যাকাণ্ড চলছে। রাত পার হয়ে সকাল হলে সবকিছু যখন পরিষ্কার দেখা যেতে শুরু করে, তখন প্রথম আমরা জানতে পেরেছিলাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা। টার্মিনাল বিল্ডিং, মূল ভবনের ভেতরটা রক্তের সাগরে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। বিদ্রোহী সৈন্যরা সেখানে মোতায়েন বিমানবাহিনীর সেনাদের নির্মমভাবে নির্বিচার হত্যা করতে থাকে।’ একপর্যায়ে সশস্ত্র বাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ধীরে ধীরে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়।
হাজিমে ইশিই বইয়ে লিখেছেন, ‘এই ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল স্থল ও বিমানবাহিনীর প্রায় ১০০ জন সেপাই। এতে বিমানবাহিনীর একজন অফিসারসহ ২১ জন অফিসার ও সেনা নিহত হন। বিদ্রোহী সেনা মিলে মোট ২০০ জনের বেশি এই ঘটনায় প্রাণ হারান বলে জানা গেছে।’
ছিনতাই বিমানের ঢাকা ত্যাগ
অভ্যুত্থানের চেষ্টা দমন করার পর বিমান ছিনতাইকারীদের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু হয়। এ সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। সেদিন (২ অক্টোবর) সকালে হাজিমে ইশিই জাপানি প্রধানমন্ত্রী ফুকুদার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। পরে দুপুরের দিকে নতুন করে দর-কষাকষি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে আরও ৪২ জন যাত্রী ও ৫ জন ক্রুকে ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। থেকে যায় আরও ২৯ জন জিম্মি ও ৪ জন ক্রু।
প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে সেদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারে ফোন করে ছিনতাই বিমানটিকে অবিলম্বে ঢাকা ত্যাগ করতে বলেন প্রেসিডেন্ট। সেই নির্দেশের পর বিমানটিকে আটকে রাখার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো সরে যায়। রাত ৯টা ১৩ মিনিটে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বিমানটি যাত্রা শুরু করে আলজেরিয়ার উদ্দেশে। আকাশ থেকে ছিনতাইকারীরা বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিল, তাদের মিশন সফল হয়েছে।
পরদিন (৩ অক্টোবর) দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল, ‘ঢাকায় ছিনতাই নাটকের অবসান’। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ঢাকা বিমানবন্দরে ছিনতাই নাটকের যবনিকাপাত ঘটিয়াছে। এ নাটকের সময়সীমা ছিল ১০৫ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। গতকাল রবিবার (২ অক্টোবর) রাত ৯টা ১৩ মিনিটে জাপান এয়ারলাইন্সের ছিনতাইকৃত ডি, সি-৮ বিমানটি মধ্যপ্রাচ্যের এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে ঢাকা বিমানবন্দর ত্যাগ করিয়াছে। ছিনতাইকারীরা ক্রুসহ ৩০ জন জিম্মিকে তাহাদের সঙ্গী করিয়াছে। অপরপক্ষে জাপানের কারাগার হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত ৬ জন সহযোগীসহ বিমানে এখন রেড আর্মীর সংখ্যা ১১। ইহা ছাড়া তাহাদের সঙ্গে রহিয়াছে জাপান সরকারের দেওয়া মুক্তিপণ ৬০ লক্ষ ডলার এবং ১০/১২ ঘণ্টার জ্বালানি।’
একই দিন ‘১০৫ ঘণ্টার উত্তেজনাপূর্ণ নাটকের অবসান’ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদনে দৈনিক বাংলা লিখেছিল, ‘ছিনতাইকারীরা যাওয়ার আগে ২৪ জন যাত্রীকে পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে গেছে বাংলাদেশকে। তাদের গন্তব্যস্থলে নিরাপদে পৌঁছালে এ ২৪ জন জিম্মিকে মুক্তি দেবে বলে তারা জানিয়েছে। এ ২৪ জনের মধ্যে রয়েছেন ১৭ জন জাপানী, ৩ জন আমেরিকান, ২ জন অস্ট্রেলিয়ান, ১ জন নিউজিল্যান্ডার ও ১ জন ইন্দোনেশিয়ান। বিমানটিতে ৬ জন বৈমানিকও রয়েছেন। আর ছিনতাইকারী ও তাদের মুক্ত সহযোগীর সংখ্যা হচ্ছে ১১ জন।’
বাংলাদেশ সময় ৩ অক্টোবর সকালে ডিসি-৮ বিমানটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে গিয়ে পৌঁছায়। কুয়েতে তখন দিবাগত রাত ১টা বেজে ৪৩ মিনিট। কুয়েত থেকে ৬০ হাজার পাউন্ডের তেল নেওয়ার পর বিমানটি ২৯ জন জিম্মি, ৪ ক্রু ও ছিনতাইকারীদের নিয়ে কুয়েত ত্যাগ করে। এরপর বিমানটি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে যায়। সেখানে ২৯ জিম্মির মধ্যে ১০ জনকে তারা ছেড়ে দেয়। সেদিনই বিমানটি আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সের উপকণ্ঠে আল বাইদা শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখানে তারা বাকি জিম্মিদেরও ছেড়ে দেয়।
শ্বাসরুদ্ধকর এ ঘটনায় জড়িত ‘জাপানিজ রেড আর্মি’ বড় বড় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ইসরায়েলের একটি বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী একটি হামলা করা ছাড়াও মানুষকে জিম্মি ও অপহরণের একাধিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল তারা। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে ইতালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ক্লাবে রেড আর্মির গাড়ি বোমা হামলার খবর পাওয়া যায়। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রেড আর্মি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ফুসাকো শিজেনেবু। তখন জাপানের আদালতে তাঁর বিচার চলছিল এবং তিনি কারাগারে ছিলেন।
৪০ বছর পর এ জি মাহমুদকে সম্মাননা
ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধানে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ জি মাহমুদ। ২০১৫ সালে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘মাই ডেসটিনি: আমার ভাগ্যলেখা’ প্রকাশ করে একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি (এপিপিএল) প্রকাশনী। সেই বইয়ে ‘জাপানি বিমান ছিনতাই’ নামে একটি অধ্যায় আছে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, বঙ্গভবনে আমি মন্ত্রিসভায় মিটিংয়ে ছিলাম। সকাল প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে আমার এডিসি আমার হাতে একটা ছোট কাগজের টুকরো দিল। তাতে লেখা ছিল, একটা ছিনতাইকৃত বিমান তেজগাঁও বিমানবন্দরের ওপর দিয়ে ঘুরছে এবং বন্দরে অবতরণের অনুমতি চাইছে। আমার পাশেই বসে ছিলেন জেনারেল জিয়া। আমি তাঁর হাতে দিলাম কাগজের টুকরোটা। লেখা পড়ে তিনি আমাকে বিমানবন্দরে গিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে বললেন। তাড়াতাড়ি আমি বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের দিকে ছুটলাম।’
এ জি মাহমুদ লিখেছেন, ‘ঢাকা বিমানবন্দরে পৌঁছেই আমি জাপানি বিমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ দিলাম যে তারা যেন অন্য কোথাও যায়। কারণ, এই নতুন দেশে তাদের চাহিদা মোতাবেক সেবা দেওয়ার যোগ্যতা আমাদের না-ও থাকতে পারে। উত্তরে তারা জানাল যে তাদের জ্বালানি কমে গেছে বিধায় যেকোনোভাবেই হোক তারা ঢাকাতেই অবতরণ করছে এবং তারা অবতরণ করল। বিমানের ভেতরে থাকা যাত্রীদের বিপদের কথা চিন্তা করে আমি তাদের অবতরণ বন্ধ করার চেষ্টা করলাম না। অবতরণের পর রানওয়ের শেষ মাথায় গিয়ে বিমান পার্ক করার নির্দেশ দেওয়া হলো পাইলটকে। এমন জায়গায় তাকে পার্ক করতে হবে, যাতে অন্য বিমানের অপারেশন বাধাগ্রস্ত না হয়। ওটা ছিল জাপান এয়ারলাইনসের বিমান ডিসি-৮, ফ্লাইট নম্বর ৪৭২। বিমানটা যাত্রা শুরু করেছিল প্যারিস থেকে। তারপর অবতরণ করেছিল এথেন্স, কায়রো, করাচি ও বোম্বাই বন্দরে। এটার গন্তব্য ছিল ব্যাংকক।’
ছিনতাইকারীরা চলে যাওয়ার কিছুদিন পর এ জি মাহমুদ জানতে পেরেছিলেন, তারা আলজেরিয়ায় পৌঁছে সব যাত্রীকে ছেড়ে দিয়েছে। বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পরবর্তী সময়ে একজন ছাড়া ছিনতাইকারীরা সবাই ধরা পড়েছিল।...এমপি মিস্টার হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে জাপান থেকে এক সংসদীয় প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছিল। জাপানি প্রতিনিধিরা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। আমার পরামর্শে মিস্টার হায়াকাওয়া একটা বোয়িং ৭০৭ বিমান কেনার জন্য আমাদের দিয়েছিলেন নগদ ৬০ লাখ ডলার।’
১৯৭৭ সালের ওই ঘটনায় বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ৪০ বছর পর ২০১৭ সালের মে মাসে জাপানের মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘অর্ডার অব দ্য রাইজিং সান, গোল্ড অ্যান্ড সিলভার স্টার’ দেওয়ার জন্য টোকিওতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এ জি মাহমুদকে। ২০১৭ সালের ৯ মে টোকিওর ইম্পেরিয়াল প্যালেসে জাপানের সম্রাট আকাহিতো ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উপস্থিতিতে এ সম্মাননা অনুষ্ঠান হয়।