অনলাইনে ভোটের প্রচারে শিশুরা: বাড়ছে বিদ্বেষ ও শিশু সুরক্ষার ঝুঁকি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারে শিশুদের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। কোথাও শিশুদের দিয়ে রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ানো হচ্ছে, আবার কোথাও তাদের দিয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলানো হচ্ছে। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবে বিদ্বেষ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বেশ কিছু কন্টেন্টের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে। কোথাও তারা সরাসরি মিছিলে অংশ নিচ্ছে, আবার কোথাও ভিডিওতে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের দিয়ে বলানো হচ্ছে, ‘আমরা যদি ভোটার হতাম, এই মার্কায় ভোট দিতাম’ কিংবা ‘বড় হলে এই মার্কায় ভোট দেব’। কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে শিশুদের ব্যবহার করছেন। তাঁদের যুক্তি, শিশুদের উপস্থিতি থাকলে ভিডিওতে বেশি সাড়া (রিচ) মেলে। তবে এতে শিশুদের উদ্দেশে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যও বাড়ছে।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি ফেসবুক রিল ভিডিওতে বিএনপির এক প্রার্থীর সমর্থনে নারীদের প্রচারের দৃশ্যের পাশাপাশি নিচের অংশে ৮–৯ বছর বয়সী এক শিশুকে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে এবং মন্তব্যের ঘরে শিশুটির উদ্দেশে নানা নেতিবাচক মন্তব্য এসেছে। আরেকটি ভিডিওতে এক শিশুকে একটি প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। সেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনার দৃশ্য তুলে ধরে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহারের ঘটনাও রয়েছে। ডিসমিসল্যাব বলছে, এমন কিছু ভিডিও আবার ‘স্ক্রিপ্টেড’ বা সাজানো।
বেশ কিছু ভিডিওতে শিশুদের দিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সামাজিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী বলেন, সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল, অবমাননাকর, নারীবিদ্বেষী কিংবা ঘৃণ্য রাজনৈতিক কনটেন্টে শিশুদের ব্যবহার করা স্পষ্টভাবেই শিশু সুরক্ষা নীতিমালার লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্বাচনী আইনেরও পরিপন্থী।
বাংলাদেশের জাতীয় শিশুনীতি ২০১১-এর ৬.৭.৪ অনুচ্ছেদে শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। কোনো প্রকার প্রলোভন বা জোরজবরদস্তির মাধ্যমে তাদের রাজনীতিতে জড়িত করা নিষিদ্ধ। তবে বাংলাদেশে এখনো সরাসরি প্রচারে শিশুদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনী বিধিনিষেধ নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভারতে নির্বাচনী প্রচারে শিশুদের ব্যবহার সরাসরি নিষিদ্ধ এবং সেখানে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘হিন্টালোভন ফাউন্ডেশন’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেওয়া জরুরি হলেও তাদের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।