পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে হত্যা, গুলিবিদ্ধসহ ৪৭টি অপপ্রচার শনাক্ত

মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে হত্যা, গুলিবিদ্ধসহ নানা মিথ্যা দাবি, পুরোনো ছবি-ভিডিও ও এআই দিয়ে তৈরি অপতথ্যছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

মা হারিয়ে দুই শিশু কান্না করছে—এমন একটি ভিডিও দেখা যায় ফেসবুকে। ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘পুলিশের সঙ্গে বিএনপির সন্ত্রাসীরা হামলা করে এক নারী গার্মেন্টস শ্রমিককে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলছে। অবুঝ ছোট একটা বাচ্চাসহ স্বজনদের আহাজারি।’

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি চলমান শ্রমিক আন্দোলনে নিহত কোনো নারী শ্রমিকের স্বজনদের আহাজারির দৃশ্য নয়। গত ১৬ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ার নোয়াপাড়ায় ডেকো গ্রুপের আগামী ফ্যাশন লিমিটেড কারখানায় কাজ করার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুমি আক্তার (২৭) নামের এক নারী শ্রমিক। পরে তাঁকে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সেই ঘটনার ভিডিও।

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার–আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকেরা। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ছে।

কোথাও দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের গুলিতে একাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছেন; কোথাও আহত ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ বলে প্রচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও, সম্পাদিত ফটোকার্ড, ভুয়া মন্তব্য এবং পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও–ছবিও আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।

পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য নিয়ে ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। আজ শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত তিনটি ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান এ ধরনের ৪৭টি ঘটনা শনাক্ত ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রিউমর স্ক্যানার ৩৩টি, ডিসমিসল্যাব আটটি ও বাংলা ফ্যাক্ট ছয়টি করেছে।

শ্রমিক নিহত ও হত্যার মিথ্যা দাবি

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার দাবি ছড়িয়েছে। ৪ নভেম্বর থেকে ফেসবুকে ‘হেমায়েতপুরে গুলি করে পাঁচজন শ্রমিককে হত্যা’ করার দাবি প্রচার করা হয়। এর আগে ৩ নভেম্বর প্রচার করা হয়, ‘পুলিশের গুলিতে আশুলিয়ায় আট শ্রমিক নিহত, আহত শতাধিক।’ এ ছাড়া গাজীপুর ও মিরপুরে কখনো দুজন, কখনো চার শ্রমিক নিহত হয়েছেন বলেও একাধিক পোস্ট ছড়ানো হয়েছে।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, হেমায়েতপুরে পাঁচ কিংবা আশুলিয়ায় আট শ্রমিককে গুলি করে হত্যার দাবির পক্ষে কোনো তথ্য–প্রমাণ নেই। গাজীপুর ও মিরপুরে শ্রমিক নিহত হওয়ার দাবিগুলোও সঠিক নয়।

আলোচিত পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে দাবিগুলোর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুরে পুলিশের গুলিতে একাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার বিষয়ে পুলিশ বা সংবাদমাধ্যমের কোনো প্রতিবেদনও পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এসব দাবির সমর্থনে তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে আন্দোলন ঘিরে হতাহত হওয়ার সব খবরই যে মিথ্যা, তা নয়। গাজীপুরে আহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেন ৩ নভেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অন্যদিকে হেমায়েতপুরে সংঘর্ষে কেউ নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।

আহত ব্যক্তিদের গুলিবিদ্ধ বলে প্রচার

আন্দোলন চলাকালে আহত ব্যক্তিদের গুলিবিদ্ধ বলে প্রচারের ঘটনাও ঘটেছে। ‘গতকাল গুলিবিদ্ধ হয়ে তানজিনা আক্তার শর্মী নামে এক শ্রমিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন’—এমন দাবিতে একটি ছবি ছড়ানো হয়।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবির নারী তানজিনা আক্তার শর্মী নন, জান্নাত। তিনি গুলিবিদ্ধও হননি। ফতুল্লায় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন তিনি। সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজে পরে তাঁকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়।

এ ছাড়া ‘পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে বাসায় ফেরার পথে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুশয্যায় বিকেএসপি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী’—এমন দাবিও ফেসবুকসহ একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগ–সমর্থিত অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি–সমর্থিত ফেসবুক গ্রুপেও দাবিটি প্রচার হতে দেখা যায়। তবে যাচাইয়ে শিক্ষার্থী নুরুজ্জামান সামির বাবা ইউসুফ রানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুল ছুটির পর বের হওয়ার সময় পেছন থেকে একটি ইটের টুকরা এসে তাঁর ছেলের মাথায় লাগে। এতে সে আহত হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

কারখানা বন্ধের বিভ্রান্তিকর দাবি

জিনস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিনস লিমিটেডের সব কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। ভিডিওতে কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে দেখা যায়।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, প্যাসিফিক জিনস লিমিটেডের সব কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার দাবিটি সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানটির ইউনিট–১–এর একটি পুরোনো ভবনে উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। ভবনটি ভেঙে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে অন্যান্য উৎপাদন ইউনিট ও প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের অন্য কারখানাগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি

শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও ছড়ানোর ঘটনাও ঘটেছে। মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। ‘তারেক রহমানের নির্দেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের মিছিলে গুলি চালাচ্ছে’—এমন দাবিতেও একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

আরেকটি ভিডিওতে এক পুলিশ সদস্যকে বন্দুক হাতে জনসাধারণের দিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এটিকেও শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানোর দৃশ্য বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিও তিনটি আসল নয়। এআই ব্যবহার করে এগুলো তৈরি করা হয়েছে।

একটি ছবি প্রচার করে দাবি করা হয়, আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশের সঙ্গে অস্ত্র হাতে মাঠে নেমেছেন বিএনপির নেতা–কর্মীরা। ছবিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে হাতে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁদের পেছনে পুলিশের কয়েকজন সদস্যও রয়েছেন।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি বাস্তব নয়। মিরপুরে লাঠি হাতে অবস্থানরত বিএনপির নেতা–কর্মীদের একটি ছবিকে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনা করা হয়েছে। এতে তাঁদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও পেছনে পুলিশ সদস্যদের ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

গণমাধ্যমের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে ভুয়া দাবি

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে সম্পাদিত ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়েছে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের লোগো–সংবলিত ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘শ্রমিকরা যদি আন্দোলন বন্ধ না করে, তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের মতো হবে।’

এ ছাড়া পোশাকশ্রমিকেরা ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন—এমন দাবিতেও একটি সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়ানো হয়।

যাচাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পক্ষে কোনো তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় টেলিভিশন চ্যানেলটির ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণার কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি। ভিন্ন একটি ফটোকার্ড ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনা করে এ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘পোশাকশ্রমিক আন্দোলনে পাঁচ দিনে ২০ জন নিহত, দুই হাজারের বেশি আহত এবং পাঁচ শতাধিক গ্রেপ্তার’—এমন দাবিতে একটি তথ্য ৫ নভেম্বর একটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, ২০ জনের মৃত্যু ও দুই হাজারের বেশি আহত হওয়ার দাবি মিথ্যা। পাঁচ শতাধিক গ্রেপ্তারের দাবিটিও অতিরঞ্জিত।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য

আন্দোলন নিয়ে রাজনৈতিক ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচারের ঘটনাও ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (শিল্প মন্ত্রণালয়) ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ছবিযুক্ত একটি ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘একেকজন হইছে গার্মেন্টস শ্রমিক আর বেতন চায় অফিসারের।’

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামে ‘এই আন্দোলনে প্রকৃত কোনো শ্রমিক নেই; তারা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে’—এমন বক্তব্যও ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়ানো হয়। একই ফটোকার্ডে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নেতা–কর্মীদের আহ্বান জানানোর কথাও উল্লেখ করা হয়।

যাচাইয়ে দেখা যায়, দুটি বক্তব্যের কোনোটিই সঠিক নয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এই দুই ব্যক্তি এমন মন্তব্য করেছেন, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে ‘Gupto TV’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে তৈরি করা পোস্টের বক্তব্যকে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

ভিন্ন ঘটনার ভিডিও জুড়ে দিয়ে প্রচার

চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়, আন্দোলনে যোগ দিতে না পারেন, সে জন্য এক নারী পোশাকশ্রমিককে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে বলা হয়, কালিয়াকৈর উপজেলার ছাত্রদলের এক নেতা ওই নারীকে বেঁধে রেখেছেন।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি প্রায় তিন মাস পুরোনো। ২০২৬ সালের আগস্টে ময়মনসিংহে এক বৃদ্ধ নারীকে হত্যার অভিযোগে ওই বৃদ্ধ নারীর পুত্রবধূকে বেঁধে রাখার দৃশ্য এটি।

‘নামাজ চলাকালে পুলিশ জুতা পরা অবস্থায় মসজিদের ভেতরে ঢুকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের খুঁজছে’—এমন শিরোনামেও একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে চলমান পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর–১০–এ হকার উচ্ছেদ অভিযানের সময় পুলিশ সদস্যদের মসজিদে প্রবেশের দৃশ্য এটি।

বিএনপির পুরোনো ভিডিও প্রচার

শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে ফেসবুকে একটি ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হয়, বিএনপির এক নেতা হাতে ভারী অস্ত্র নিয়ে গাজীপুরে শ্রমিকদের আন্দোলনে হামলা করেছেন।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি পোশাকশ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনার নয়। চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দলের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র হাতে এক যুবকের প্রতিপক্ষকে ধাওয়া করার ছবি এটি।

এ ছাড়া ‘গার্মেন্টস কর্মীদের আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী নিজেও রাজপথে নেমে আসেন’—এমন শিরোনামে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা সফরে গিয়ে প্রটোকল ভেঙে গাড়ি থেকে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশেছিলেন। ভিডিওটি সেই সময়ের।

ছড়ানো হয়েছে জুলাই আন্দোলনের ভিডিও

পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে আহত এক শ্রমিকের বক্তব্য দাবি করে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে কাঁদানে গ্যাসের শেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা যায়। এ সময় তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি যদি মারাও যাই, আপনারা পিছপা হবেন না।’

প্রচারিত ভিডিওটি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের নয়, সাম্প্রতিক সময়েরও নয়। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে অসুস্থ হয়ে পড়া এক ব্যক্তির পুরোনো ভিডিওকে নতুন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

ভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিডিও শ্রমিক আন্দোলনের নামে

‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে টাকা বিলিয়ে লোক ভাড়া করা হচ্ছে’—এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি ইনকিলাব মঞ্চের ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচির দৃশ্য।

এ ছাড়া নারী পোশাকশ্রমিকদের গায়ে পুলিশের হাত দেওয়ার দৃশ্য দাবি করে আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। তবে ভিডিওটি সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভের নয়। গত অক্টোবরে ‘নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিলের’ দাবিতে সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি সংগঠনের বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিপেটার দৃশ্য।

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, সব গার্মেন্টস শ্রমিক শপথ নিয়েছেন যে, যেভাবেই হোক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনবেন।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি শ্রমিক আন্দোলনের নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার শপথ নিয়েছিলেন। সে সময়ের ভিডিওকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে প্রচার করা হয়েছে।

পুরোনো ছবি প্রচার

৪ নভেম্বর ফেসবুকে এক ব্যক্তির মরদেহের ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ‘কিছুক্ষণ আগে পুলিশের গুলিতে সাভারে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।’ সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতও নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দাবিটি প্রচার করেন।

যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি ৪ নভেম্বর সাভারে পুলিশের গুলিতে নিহত কোনো শ্রমিকের নয়। ২১ সেপ্টেম্বর বাগেরহাটের রামপালে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে চাচাতো ভাইদের হামলায় নিহত আহাদ আহমেদ নামের এক যুবকের ছবি এটি।

আরেকটি ছবি প্রচার করে দাবি করা হয়, যুবলীগ সন্দেহে এক পোশাকশ্রমিককে বিএনপি–জামায়াতের সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করেছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি সাম্প্রতিক শ্রমিক বিক্ষোভের নয়। গত জুনে ফেনীতে যুবলীগ নেতা জোবায়ের পারভেজ হত্যার ঘটনার ছবি এটি।

নতুন বেতনকাঠামোর ভুয়া তালিকা

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ১ নভেম্বর নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। এরপর ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের গেজেট’ শিরোনামে নতুন বেতনের একটি তালিকা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাম উল্লেখ করে ফেসবুকে প্রচার হতে দেখা যায়। দাবি করা হয়, এটি পোশাকশ্রমিকদের নতুন বেতনকাঠামোর তালিকা।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, তালিকাটি নতুন মজুরি কাঠামোর নয়। নতুন মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠন করা হলেও পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি ডিসেম্বরে নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

৪ নভেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী। সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বোর্ডের দ্বিতীয় সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষ পৃথকভাবে মজুরি প্রস্তাব জমা দেবে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ সদস্যও একটি মজুরি প্রস্তাব দেবেন। এরপর এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।

পোশাকশ্রমিকদের নতুন বেতনকাঠামোর তালিকা প্রকাশের বিষয়ে গণমাধ্যমে কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যায়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজেও এ–সংক্রান্ত কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি।

হা–মীম গ্রুপের কর্ণধারকে গ্রেপ্তারের ভুয়া দাবি

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে জড়িয়ে ফেসবুকে দাবি করা হয়, হা–মীম গ্রুপের কর্ণধার ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি পোস্টে বলা হয়, তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের কারণ, মামলার বিস্তারিত তথ্য ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলা হয়।

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, হা–মীম গ্রুপের কর্ণধার এ কে আজাদের গ্রেপ্তারের দাবিটি সঠিক নয়। কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য–প্রমাণ ছাড়াই তাঁর গ্রেপ্তারের এই দাবি প্রচার করা হয়েছে।