তখন বেলা ৩টা ১০। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। অতীত হয়ে গেলেন বাংলাদেশ ও সংস্কৃতির এক অন্ধপ্রেমী, এক দুর্নিবার যোদ্ধা। তবে সেটি পঞ্জিকার একটি দিনই কেবল। অনন্তকালের জন্য ঝলমলে বর্তমান হয়ে রয়ে গেছে তাঁর অক্ষয় মানস-কর্ম-অর্জন। আজন্ম দেশ আর মানুষকে ভালোবেসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক আকাশছোঁয়া মহিরুহ। সেই ভালোবাসায় বাঙালি সিক্ত। সজীব সন্জীদা খাতুনের নিত্যকার বসবাস ছিল সুস্পষ্ট সাদা আর কালোর সংমিশ্রণে। সর্বদা আলোচনায়, নন্দিত বা নিন্দিত। বিদায়ক্ষণেও যার অন্যথা হয়নি।
আধুনিকতার আদিখ্যেতা, সিগারেট টানে! নইলে লোকে রটায়, ‘কালা লিপস্টিক ল্যাপে।’ দূরের মানুষ বলতেই পারে। সেই ছোট্ট থেকেই তো বিড়িফোঁকা কালো ঠোঁট। অথচ ফোঁকা বা লেপার অভ্যাস হয়নি কখনো। দূর থেকে দেখা, মুখের কথায় চেনা; অথবা গান শুনে কিংবা লেখা পড়ে জানা মানুষটাকে মনে হতেই পারে কেতাদুরস্ত, মেজাজি, উন্নাসিক, আত্মম্ভরি, দাম্ভিক; জ্ঞান-গুণের ভারাবেগে মাটিতে পা পড়ে না!
দুর্ভাগা! তাদের কাছে আড়ালেই থেকেছে সত্যটি। সান্নিধ্য পেয়েছেন যাঁরা, তাঁরা জানেন, তিনি সাদাসিধা, নিরাভরণ, আটপৌরে ও আন্তরিক। তাঁরা এ–ও জানেন, শৃঙ্খলা-নীতি-সততা-মানবতার প্রশ্নে আপসহীন, ওজস্বী, প্রতিবাদী; আজন্মই বাঙালি নারীর সহজাত কোমলতা, সারল্য, মমতা আর উদারতার প্রতিচ্ছবি। তবে মোটেও নারীর তকমাধারী নন; কর্মে নর–নারীর ভেদভোলা মানুষ। সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হলেই কী, তিনি নারী হিসেবে মোটেও আলাদা করুণা বা বিবেচনার মুখাপেক্ষী নন। তাঁর জেদ—কেউ মেয়ে হলেই মেধা-জ্ঞান-প্রজ্ঞায় কারোর চেয়ে পিছিয়ে পড়া নয়, মানুষই। বিশ্বাস করতেন, কর্মেই মানুষের পরিচয়। তাই কখনোই নারীবাদী দাবিদাওয়া বা আন্দোলনে শামিল হননি। অনুকম্পা গ্রহণ দূরের কথা, ঈর্ষণীয় ত্যাগী তিনি। দেহ–মন সবই নিবেদন করেছেন মানবকল্যাণে, জীবনে-মরণে।
অস্বীকার করার জো নেই, নির্দিষ্ট কোনো বিশেষে অতল মোহ আছে কি নেই, ছিলেন স্বাধিকার-সাম্য-সমাজসেবা এবং শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে আসক্ত। দেশ, মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি বিসর্জন দিয়ে নয়; বরং সেসবই বড্ড টানত তাঁকে। সবকিছুর রসাস্বাদনেই গড়ে তুলেছেন নিজেকে। নির্মিত হয়েছে অভূতপূর্ব এক সাত্ত্বিক মানবিক সাম্রাজ্য।
তবে। যত দিনের চেনাজানা, শুরু থেকে পুরোটাজুড়ে আরেক আবিষ্কার, চরমভাবাপন্ন। তিনি সন্জীদা খাতুন। সাধারণ সম্বোধনে সবার আপা বা মিনু আপা। নরম তো নরম, গরম হলে রীতিমতো ছ্যাঁকা দেওয়া তেজ। হ্যাঁ। তাঁর সংস্পর্শে, কোমলাভ ছোঁয়ায়, স্নেহচ্ছায়ায় অনেকে নির্ঝঞ্ঝাটে ছোট থেকে মাঝারি হয়ে বড় মাপের মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর মায়া আর আদর্শের বলয় থেকে ছিটকে পড়ে কেউ আবার জ্বলেপুড়ে খাক হয়েছে। নরম-গরমের কোনো জোড় বা মাঝপথ ছিল না তাঁর। না ছিল নীতি আর আদর্শের কোনো স্খলনকে আশকারা দেওয়া। পেশাগত ভাষা–সাহিত্যের শিক্ষকতার বাইরে সমাজ উন্নয়নে যত সংগঠনে জড়িয়েছেন; সময় আর মনপ্রাণ উজাড় করে দিয়ে তার প্রথম সারির নেতা-কর্তা হয়েছেন। আদর্শ আর নীতির বাইরে একচুল সরতে দেননি কাউকে। সে হলোই–বা স্বৈরতন্ত্র!
জ্ঞানবয়স থেকে সন্জীদার তিন ছেলেমেয়েরই এটি এক অভূষিত অভিজ্ঞতা। ধ্রুব। হার্দিক গ্রহণ বা নির্লেশ সম্পর্কচ্ছেদ। অথচ প্রথম দেখায় আপন-পর সব মানুষের জন্যই তাঁর মমতা অফুরান। সে যে কী অপার স্নেহ-শ্রদ্ধা, কী যে প্রশ্রয়! অভূতপূর্ব! মানুষকে ভালোবাসতে জানেন বটে। ষোলো আনাই আস্থায় নিয়ে বসেন। সর্বজনকেই পরম আদরে কাছে টেনে নিতেন, সব সুখ-দুঃখের সাথি; কিন্তু সততা-নীতি-মানবতার পান থেকে চুন খসেছে কি চিরতরের বিচ্ছেদ!
মনের অমিল হলে নিজ প্রতিবেশ, জাগতিক পেশা আর মানবিক নেশার সংঘের কারও কখনোই ছাড় মেলেনি। নিজে সত্যের সেবক, কাছে ঘেঁষা অযুতজনকে বরাবরই তেমন অকপট ও সজ্জন মানতেন। অনেকে বলেন, বড্ড কানকথায় বিশ্বাসী! সর্বৈব সত্য। কেউ কারও বিষয়ে সউদ্দেশ্য, বানিয়ে বা ভুল ব্যাখ্যা করে কিছু জানালে নিখাদ বিশ্বাসে নেন এবং সেই মতো মেপে ফেলেন আলোচিত জনকে। সেখান থেকে আপাকে টলানো? বিষম এক কম্ম!
ঘরে তেমন নয়; কিন্তু বাইরের জগতে এসব নিয়ে বিভ্রাট ঘটেছে অহরহ। কারণ, কারও বিষয়ে কিছু বলতে গিয়ে নিজের মত বা পর্যবেক্ষণটাও চাপিয়ে দেওয়া এ দেশের সাধারণ বৈশিষ্ট্য বটে। লৌহকঠিন মন ও মমতাবিধৌত হৃদয়ের মিশেল-সন্ধান পেয়েছে আপার কর্ম–আবহে বাস করা অনেকেই। সর্বার্থেই তারা জিতেছে, দেশ-দশ নিয়ে স্বপ্নলোকের চাবি। সুচেতনেরা দীর্ঘকাল টিকেছেন সন্জীদা–মণ্ডলে, টিকিয়ে রেখেছেন বহুজনকে।
কঠোর–নিঠুর বলতেই–বা দোষ কী! কঠিনের আবার ছিল রকমফের। আপার আজন্ম-সঞ্চিত মনোভাব থেকে কখনো–সখনো সন্তানদের কিছু নিস্তার মিলেছে বৈকি; কিন্তু ছাড় পাননি স্বয়ং স্বামীবরও। একাত্তরের শরণার্থী জীবনের শুরুতে ওয়াহিদুল যখন ফ্লোরাকে পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করার আবদার জানালেন। তিন নাবালক সন্তানকে নিয়ে আলাদাই হয়ে গেলেন সন্জীদা। ফিরেও তাকাননি। জীবনসঙ্গীকে মন থেকে মুছে ফেলেছেন; কিন্তু কী অদ্ভুত! যে দোষে মন মলিন, সে বিষয়ে বিচ্ছেদ। আবার সেই একই মানুষের মনোরম অংশ নিয়ে দিব্যি কাজ করে চলা। মনের যে অংশে অমিল, কেবল সেখান থেকেই ওয়াহিদুল নির্বাসিত। যে যে অংশে দুজনে একই আদর্শের অনুগামী, সেসব ক্ষেত্রে কাঁধে কাঁধ বেঁধে কাজ করে গেছেন দুজন।
মানুষকে ভালোই কাটাছেঁড়া করতে পারঙ্গম সন্জীদা। মন্দটাকে এড়িয়ে ভালোর সঙ্গেই সংঘ বেঁধেছেন। কাজের সম্পর্ককে মূল্য দিয়েছেন ব্যক্তি-সম্পর্কের ওপরে। মানুষের চেয়ে বড় ছিল সংগঠনের স্বার্থ, তার চেয়ে দড় দেশ। যার সবচেয়ে অনুপম দৃষ্টান্ত ওয়াহিদুল। বাংলাদেশ মুক্তসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা দিয়ে সে নয়া অধ্যায়ের অভিষেক। সংগীতকে অন্তর্লীন করে বাঙালির সংস্কৃতি আর মনন সাধনায় যুগল পথচলা; কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছেদ? ক্ষমা পায়নি কখনো। তাঁর অধিকার নেওয়া পরিমণ্ডলের ইয়ত্তা মেলা ভার! নাকি তল পাওয়া যায় সন্জীদার ছোট, সমবয়সী, বড় বন্ধু-ভক্ত-অনুসারী গড়ে তোলার গভীরতায়! তাঁর লেখাপড়ার উঠান নারীশিক্ষামন্দির, আনন্দময়ী, ইডেন স্কুল-কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী। পরিবার-পরিজন, শৈশবের মুকুল ফৌজ, কৈশোরের ব্রতচারী, যৌবনের ছাত্রী সংসদের কোলে জন্মাবধি জড়ো হয়েছে জীবনপাঠ। প্রতিবেশী শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সেগুনবাগান, বকশীবাজার, আজিমপুর, বিশ্বভারতী ক্যাম্পাস, কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাস, গ্রিন রোড ও ধানমন্ডিতে। অমন বৈচিত্র্যমণ্ডিত বিশাল ব্যাপ্তিতে মানুষটার সঙ্গী-সহযাত্রী জুটেছে অগণন। তাঁদের আবেশিত-মোহিত করেছে সন্জীদার সরলতামাখা নৈতিক ভারসাম্য, সততা, মানবতা, সমাজসাম্য, পরার্থবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, নির্ভীক মতপ্রকাশ, মনুষ্যত্ব, নেতৃত্ব, সংগঠকসত্তা এবং শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, সংস্কৃতি, স্বাজাত্য, দেশপ্রেম। সব মিলে এক, সবার দৃশ্যপটে এক বৈশ্বিক মানবচেতনা।
কী পরম সৌভাগ্য! চলার পথে সন্জীদা পেয়েছেন অগণ্য সমমনা। হাতে হাত ধরে গড়েছেন ছায়ানট, জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, ব্রতচারী, নালন্দা; হাতে হাত রেখে এগিয়ে নিয়েছেন কণ্ঠশীলনকে। তবে সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবিচ্ছেদ্য সহচর, সেই ধ্রুব সত্য, কোমল-কঠিনের চরম ভাব।
শাশ্বত সম্পূর্ণ বাঙালি হয়েই কায়া থেকে ছায়া হয়ে গেলেন সন্জীদা। বটচ্ছায়া। গড়ে গেছেন বিশ্বমানব হওয়ার এক বিশাল রাজপথ। সে পথের যাত্রী কজন? গুটিকয়, নাকি অযুতজন!
● পার্থ তানভীর নভেদ্: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী, সন্জীদা খাতুনের সন্তান