দুর্গম এলাকায় ভিডব্লিউবি কর্মসূচি
অফলাইন অ্যাপে আবেদন ৩৯%
সবচেয়ে বেশি আবেদন রংপুরে, কম সিলেটে।
সারা দেশে মোট আবেদন ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩৭।
এবার মোট কার্ড বরাদ্দ থাকছে ১০ লাখ ৪০ হাজার।
দুস্থ নারীদের সহায়তা কর্মসূচি ভালনারেবল উইমেন বেনিফিটের (ভিডব্লিউবি) জন্য দুর্গম ৪৩টি উপজেলায় মোট আবেদনের ৩৯ শতাংশ অ্যাপের মাধ্যমে জমা হয়েছে।
পাহাড়, হাওরসহ দুর্গম এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকলেও আবেদন করতে যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য ৪৩টি উপজেলায় পাইলট আকারে প্রথমবারের মতো অফলাইন অ্যাপটি চালু হয়। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর পরিচালিত কর্মসূচিটি চলতি বছর ভিডব্লিউবি নামে শুরু হয়। এর আগে কর্মসূচিটির নাম ছিল দুস্থ মহিলা উন্নয়ন বা ভিজিডি।
সারা দেশে কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের আড়াইগুণের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। ২০২৩–২৪ চক্রের জন্য সর্বোচ্চ প্রায় ২৬ লাখ আবেদন জমা পড়ে। এর আগের চক্রে ২০ লাখের মতো আবেদন জমা হয়েছিল। আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে রংপুর থেকে এবং সবচেয়ে কম আবেদন পড়েছে সিলেট থেকে।
ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের আড়াইগুণ বেশি আবেদন জমা।
এ কর্মসূচির আবেদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার এবং ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের আবেদন জমা দিতে সহায়তা করা হয়।
ভিডব্লিউবির কর্মসূচি কর্মকর্তা আয়েশা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, সারা দেশে কর্মসূচিতে তালিকাভুক্ত হতে আবেদন জমা হয় ২৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩৭টি। ভিডব্লিউবি চক্র ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই বছরের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০ লাখ ৪০ হাজার কার্ড। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পরিমাণ দরিদ্র নারী উপকারভোগীদের বাছাই করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে উপকারভোগীরা দুই বছর ধরে মাসে ৩০ কেজি করে চাল সহায়তা পান।
আয়েশা আক্তার বলেন, নতুন চক্রের জন্য আবেদন নেওয়া হয় গত বছরের ১০ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। যাচাই–বাছাই শেষ হয় গত ডিসেম্বরে।
অ্যাপে আবেদন প্রায় দেড় লাখ, অনেকেই আগ্রহী নয়
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, দুর্গম ৪৩টি উপজেলায় বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলেও অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করা গেছে। স্মার্টফোনটি ইন্টারনেট সংযোগে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবেদনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনলাইনে জমা হয়ে যায়।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদনের জন্য চলতি বছর ওয়েবসাইটের পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়। অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে ‘VWB’ নামে পাওয়া যায়। ওয়েবসাইট ও অ্যাপ তৈরিসহ কারিগরি ও প্রচারে সহায়তা করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
৪৩টি উপজেলায় ওয়েবসাইট ও অ্যাপে মোট আবেদন জমা পড়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৬২১টি। এর মধ্যে অ্যাপ ব্যবহার করে আবেদন হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬২১টি। অ্যাপের মাধ্যমে হওয়া আবেদনের মধ্যে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় অর্থাৎ অ্যাপ ব্যবহার করে অফলাইনে ৫১ হাজার ৪৩১টি এবং অ্যাপ ব্যবহার করে অনলাইনে ৯৬ হাজার ১৯১টি আবেদন হয়েছে। ওই সব উপজেলায় মোট বরাদ্দ রয়েছে ৮৩ হাজার ৩৮৬টি।
৪৩টি উপজেলার মধ্যে রয়েছে—বান্দরবানের ৬টি, রাঙামাটির ৮টি, খাগড়াছড়ির ৮টি, কক্সবাজারের ৫টি, সুনামগঞ্জের ১০টি, নোয়াখালীর হাতিয়া, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ ও নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরি।
তবে বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে জানা গেছে, অফলাইন অ্যাপ ব্যবহার করে আবেদনের ক্ষেত্রে অনেকেই আগ্রহী হননি।
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের বান্দরবান জেলার উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় ইন্টারনেট সমস্যা তো আছেই। আর ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক একেবারেই নেই। ফলে অফলাইন অ্যাপে এই সমস্যা দূর হবে বলে আশা করা হয়েছিল।
কিন্তু অনভ্যস্ততার কারণে অনেকে আগের মতো সদরে এসে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও ‘তথ্য আপা’র সহায়তা নিয়ে আবেদন করেছেন। অ্যাপে আবেদন কম হয়েছে। তিনি জানান, ভিডব্লিউবি কর্মসূচির চলমান চক্রে বান্দরবানের উপকারভোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৯।
বান্দরবানের ৭টি উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নেই। কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়ার উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা উপজেলায়।
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন এবং ধর্মপাশা উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফাহিমা খানম বলেন, তাঁদের ওখানে অ্যাপে কোনো আবেদন জমা পড়েনি।
জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আবেদন জমা নেওয়ার আগে এ নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে বৈঠক করা হয়েছিল। এরপরও অ্যাপে আবেদন হয়নি।
ফাহিমা খানম বলেন, বিভিন্ন ধরনের ভাতার কারণে লোকজন প্রায়ই সদরে চলে আসেন। এই আবেদনের সময়ও কারও সহায়তা নিয়ে অ্যাপে আবেদন না করে নারীরা সরাসরি সদরে চলে এসেছিলেন। শান্তিগঞ্জে ১ হাজার ৯৮৩টি এবং ধর্মপাশায় ২ হাজার ১৬৮টি কার্ড বরাদ্দ রয়েছে।
রংপুরে আবেদন বেশি, সিলেটে কম
ভিডব্লিউবি কর্মসূচি থেকে জানা গেছে, আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা হয়েছে রংপুর থেকে। এ সংখ্যা ৫ লাখ ৬১ হাজার ৭৩২। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৪ লাখ ৪১ হাজার ৩২১, খুলনায় ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৬, ঢাকায় ৩ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫, চট্টগ্রামে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯৩, ময়মনসিংহে ২ লাখ ৮২ হাজার ৩৭৩, বরিশালে ২ লাখ ৩৩ হাজার ২৯২ এবং সিলেট বিভাগ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৬৫টি আবেদন জমা হয়েছে।
ভিডব্লিউবি কর্মসূচিতে একবার যিনি তালিকাভুক্ত হন, তিনি দুই বছর মেয়াদ শেষ করার পর পরবর্তী চার বছর পর্যন্ত আর তালিকাভুক্ত হতে পারেন না। কর্মসূচির পরিপত্রে নতুন তিনটি শর্ত যুক্ত হয়েছে। আগে শর্ত ছিল উপকারভোগী নারীদের অঙ্গীকার করতে হবে—পরিবারের মেয়েটিকে বাল্যবিবাহ দেবেন না। এবার যুক্ত করা হয়েছে, অঙ্গীকার পূরণ না করলে উপকারভোগীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। আরও দুটি শর্ত হচ্ছে—পরিবারে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ে রয়েছে, সেই পরিবার এবং প্রত্যাগত অভিবাসী পরিবার উপকারভোগী হিসেবে অগ্রাধিকার পাবে।