দেবী সরস্বতীর আগমন ঘিরে মুখর শাঁখারীবাজার
মাঘ মাসের হালকা শীতের সকাল। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারের সরু গলিতে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাতাসে ভাসছে ধূপ আর চন্দনের ঘ্রাণ, কানে ভেসে আসছে শাঁখের ধ্বনি আর ঢাকের তালে তালে মন্ত্রোচ্চারণ। কোথাও আবার শোনা যাচ্ছে হাতুড়ি-বাটালির টুং টাং শব্দ। সরস্বতী প্রতিমায় শেষ ছোঁয়া দিতে ব্যস্ত কারিগরদের এমন কর্মযজ্ঞে শাঁখারীবাজার এখন পরিণত হয়েছে উৎসবের মহল্লায়।
শাঁখারীবাজার পুরান ঢাকার অন্যতম হিন্দুধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত এলাকা। এখানে সরস্বতীপূজায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি রয়েছে শত বছরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শাস্ত্রমতে, প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর বন্দনা করা হয়।
বিদ্যার দেবী সরস্বতীর কৃপালাভের আশায় ঘরে ঘরে, মন্দিরে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয় পূজা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কাছে এই পূজার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক সনাতন পরিবারে এই দিন শিশুদের দেওয়া হয় হাতেখড়ি।
পূজা উপলক্ষে বৃহস্পতিবার শাঁখারীবাজারে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সরেজমিনে দেখা যায়, শাঁখারীবাজারের অলিগলিতে প্রতিমা তৈরি ও বিক্রিতে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা। শাঁখারীবাজারের প্রতিমা ব্যবসায়ী কমল বলেন, ‘৮ বছর ধরে এই ব্যবসার সাথে আছি। প্রতিমাগুলো সব আমার নিজের বানানো। প্রতিমাগুলো আকারভেদে ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা, আবার ৬০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে যেমন নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ এবং উত্তরা, মিরপুর থেকেও অনেকেই এখানে আসেন প্রতিমা কেনার জন্য। সরস্বতীপূজায় শাঁখারীবাজারের অর্থনৈতিক চিত্রেও স্বল্প সময়ের জন্যও প্রভাব ফেলে। পূজায় অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই এলাকায় বেড়ে যায় কেনাবেচা। প্রতিমা, ফুল, পূজার উপচার, পোশাক ও মিষ্টির দোকানগুলোতে দেখা যায় ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। পূজা উপলক্ষে নিয়মিত ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অসংখ্য অস্থায়ী দোকানিও প্রতিমা, পূজা উপচার ও ফুলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
পূজার আয়োজন শুধু প্রতিমায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গাঁদা ফুলের মালা, আমের ডাল, আমের মুকুল, পলাশ ফুল, বেলপাতা, তুলসী ও নিমপাতা, দূর্বা ঘাস, যব, ধান, কাঁচা হলুদসহ নানা উপাদান নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। ফুল বিক্রেতারা জানান, এ বছর ফুলের দাম একটু বেশি হলেও বিক্রি ভালো হচ্ছে। শেষ দুই দিনেই সবচেয়ে বেশি থাকে ক্রেতারা।
যাত্রাবাড়ী থেকে শাঁখারীবাজারে কেনাকাটা করতে এসেছেন ইস্মিতা সরকার। তিনি কেন এখানে আসেন, জিজ্ঞেস করলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরস্বতীপূজার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সামগ্রী এখানে পাওয়া যায় বলেই প্রতিবছর এখানে আসি। এখানে দেবী সরস্বতীর প্রতিমা, ফুল, ধূপ, প্রদীপ, বই–খাতা, বীণা, শোলা ও অন্যান্য উপচার সহজেই পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রয়োজনীয় সব সামগ্রীর জন্য আলাদা ঘুরতে হয় না। যদিও পূজার সময় শাঁখারীবাজারে মানুষের চাপ অনেক বেড়ে যায় এবং চলাচলে কিছুটা ভোগান্তি থাকে। তবে চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশ, রঙিন সাজসজ্জা, শঙ্খধ্বনি ও ভক্তদের আন্তরিকতায় সে কষ্ট চলে যায়।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাঁখারীবাজারে সরস্বতীপূজা মানেই উৎসবের আমেজ। বাসাবাড়ি, স্কুল–কলেজ ও বিভিন্ন ক্লাবেও দেবীর আরাধনা করা হয়। আগামীকাল শুক্রবার সকালে অঞ্জলির মাধ্যমে শুরু হবে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা।
শাঁখারীবাজারের বাসিন্দা তিয়াস দেবনাথ প্রথম আলোকে বলেন, শাঁখারীবাজারে সরস্বতীপূজা আমাদের জন্য প্রাচীন ঐতিহ্য। সবাই একসাথে দেবীর বন্দনা করে, শিশুদের হাতেখড়ি শুরু হয় আর পুরো এলাকা উৎসবের আমেজে ভরে ওঠে। দেবীর আগমন উপলক্ষে পুরো এলাকা সাজে নতুন সাজে।