সব মিলে দেশের মোট জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ ব্যবহার করে পরিবহন খাত। প্রায় ১৬ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। শিল্প খাত ৭ ও বিদ্যুৎ খাত ব্যবহার করে ১০ শতাংশ।

বিপিসির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দেশে ফার্নেস তেলের ৪০ দিনের মজুত আছে এখন। অকটেন আছে ২২ দিনের। আর জেট ফুয়েলের মজুত দিয়ে চালানো যাবে ৩৮ থেকে ৪৫ দিন। প্রতি মাসেই সব মিলিয়ে গড়ে চার লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল আমদানি করে বিপিসি। এ ছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অধিকাংশই নিজেরা ফার্নেস তেল ও ডিজেল আমদানি করে থাকে। তাই বেসরকারি খাতেও জ্বালানি তেলের মজুত আছে।

গত কয়েক দিনে ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে এসে পৌঁছেছে তিনটি জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, ১৯ জুলাই এসেছে ৩১ হাজার ৬৭৭ টন ডিজেল। আর ২৩ জুলাই এসেছে ৩৩ হাজার ৮০২ টন এবং ৩২ হাজার ৯৪২ টন ডিজেল। এ ছাড়া ১৯ হাজার ৯ টন ফার্নেস তেলের একটি জাহাজ এসেছে গতকাল। গভীর সমুদ্রে থাকা এসব জাহাজ থেকে শিগগিরই জ্বালানি তেল খালাস শুরু হবে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন কিছুটা নিম্নমুখী। দাম কমতে থাকলে তেল আমদানিতে গতি আসতে পারে।

এর আগে ডলার-সংকটের কারণে আমদানি জটিলতায় পড়ে বিপিসি। এ মাসের শুরুতে জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা জানিয়ে বিপিসি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে চিঠি দেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে এটি জানায় জ্বালানি বিভাগ। এরপর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গত মঙ্গলবার থেকে দেশের সব ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় সরকার। এ ছাড়া ওই সময় সপ্তাহে এক দিন পেট্রলপাম্প বন্ধের প্রস্তাব করা হলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে পেট্রলপাম্পে জ্বালানি তেল রেশনিং (সরবরাহ কমানো) করার চিন্তা চলছে বলে জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

জ্বালানি তেলের মজুতের বিষয়ে গতকাল বিপিসির চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদা বুঝে ৩০ থেকে ৪০ দিনের মজুত রাখা হয়। গুজবে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আগামী এক মাসের মধ্যে আরও ৭ থেকে ১০টি জাহাজ দেশে আসবে জ্বালানি তেল নিয়ে।

জ্বালানি তেল বিক্রয়ের সরকারি কোম্পানি পদ্মা ও মেঘনার সবচেয়ে বেশি ডিজেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে। পদ্মার ডিজেল মজুত সক্ষমতা ১ লাখ ৬৭ হাজার টন এবং মেঘনার সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন। বর্তমান মজুতের পরিমাণ না জানালেও এ দুটি কোম্পানির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এখন ডিজেলের কোনো সংকট নেই। পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির নেতারাও সরবরাহে কোনো ঘাটতি পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তাঁদের মধ্যে সরবরাহ কমার শঙ্কা আছে।

ঋণপত্রে জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি

দেশের চাহিদার প্রায় শতভাগ জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। জ্বালানি তেল আমদানিতে প্রতি মাসে ১৬ থেকে ১৭টি আমদানি ঋণপত্র খুলতে হয়। ডলারের ঘাটতি রয়েছে জানিয়ে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে প্রায়ই অপারগতা প্রকাশ করছে। তবে জ্বালানি তেল আমদানি করতে বিদেশি সরবরাহকারীদের বিল পরিশোধ ও ঋণপত্র খোলা নিয়ে বিপিসির জটিলতা আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) সংকট থাকায় ব্যাংকের দীর্ঘসূত্রতা এখনো কমেনি।

জ্বালানি বিভাগ, বিপিসি ও ব্যাংক সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জনতা ব্যাংক একটি ঋণপত্রের আংশিক খুলেছে। আরও দুটি ঋণপত্র ব্যাংকে জমা আছে। অগ্রণী ব্যাংক একটি ঋণপত্র খুলেছে, আরও দুটি জমা আছে। সোনালী ব্যাংকে দুটি ঋণপত্র আটকে আছে। বিপিসির বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব থেকে ডলার স্থানান্তর করে এ ব্যাংকের একটি ঋণপত্র খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রূপালী ব্যাংক নিয়মিত ঋণপত্র খুলছে। আর ইসলামী ব্যাংকে নতুন করে ২০০ কোটি টাকার তহবিল জমা দিয়ে একটি ঋণপত্র খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এভাবে ঋণপত্র আটকে থাকলে জ্বালানি তেল আমদানি বিঘ্নিত হতে পারে। জ্বালানি তেল সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানির পাওনা এখন কিস্তিতে পরিশোধ করা হচ্ছে। এটিও ঠিকমতো শোধ করা যাচ্ছে না। ব্যাংকে আটকে থাকা ঋণপত্রের মাধ্যমে আগামী মাসের জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছ। আর্থিক বিভাগের সহযোগিতা না পেলে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কায় আছে বিপিসি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানি তেল আমদানি কমাতে হলে পরিবহনে ব্যবহার কমাতে হবে। সেটা তো সম্ভব হচ্ছে না। সরকার হয়তো বুঝেশুনে ডলার খরচ করছে। তবে জ্বালানি তেল অগ্রাধিকার পণ্য, এটি আনতেই হবে, সরবরাহ করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন