সড়ক দুর্ঘটনা
দুদিন পর জ্ঞান ফিরলে জানতে পারেন শ্বশুর, স্বামী আর সাড়ে তিন বছরের মেয়েটিও মারা গেছে
চুয়াডাঙ্গা থেকে রাতে ফেরার পথে গাড়িতে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বসে ছিলেন। কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়েও পড়েছিলেন সাবরীনা জাহান (শমী)। রাজধানীর একটি হাসপাতালের বিছানায় দুই দিন পর জ্ঞান ফিরলে জানতে পারেন, গাড়িতে থাকা শ্বশুর, স্বামী এবং বুকে জড়িয়ে রাখা সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়েটাও মারা গেছে। অথচ কিছুই মনে নেই সাবরীনার।
গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাত তিনটার দিকে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার গাইদঘাট এলাকায় যশোর-মাগুরা আঞ্চলিক মহাসড়কে দুর্ঘটনায় সাবরীনা একসঙ্গে তিনজন প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন। চুয়াডাঙ্গায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে যশোরে নিজেদের বাসায় ফেরার পথে তাঁদের প্রাইভেট কারটি চালাচ্ছিলেন সাবরীনার স্বামী মাহমুদ হাসান জাকারিয়া। তিনি ছিলেন আইটি ইঞ্জিনিয়ার, পাশাপাশি ব্যবসাও করতেন। নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রাইভেট কারটি সড়কের পাশে একটি বটগাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল। তখনকার ভিডিও-ছবি এখন পর্যন্ত দেখার সাহস পাননি সাবরীনা।
গাড়িতে সামনে বসেছিলেন সাবরীনার স্বামী মাহমুদ হাসান জাকারিয়া ও শ্বশুর আবদুল মজিদ সরদার। তিনি পল্লী বিদ্যুতের সাবেক পরিচালক ও ইটভাটার মালিক ছিলেন। গাড়ির পেছনের সিটে সাবরীনা, তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে সামিন আলমাস, সাড়ে তিন বছর বয়সী মেয়ে মাহাদিয়া হাসান সেহরিশ এবং সাবরীনার শাশুড়ি মিনোয়ারা বেগম বসেছিলেন। গাড়িতে থাকা পরিবারটির ছয় সদস্যের মধ্যে তিনজনই মারা যায় ওই দুর্ঘটনায়।
যে তিনজন বেঁচে ফিরলেন, তাঁরা এখন কেমন আছে, তা জানতেই মুঠোফোনে কথা হয় সাবরীনার সঙ্গে। জানালেন, দুর্ঘটনায় তাঁর শাশুড়ির পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। আগে থেকেই তাঁর পায়ে ‘ডিভাইস’ লাগানো ছিল। দুর্ঘটনায় সেটি ভেতর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। রাজধানীর একটি হাসপাতালে গত মঙ্গলবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। তিনি আবার একা একা হাঁটতে পারবেন কি না, তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেরও দুর্ঘটনায় হাত ও পা ভেঙেছিল। আপাতত ভালো আছে। দুর্ঘটনার পর আর স্কুলে যেতে পারেনি। বাসায় শিক্ষক এসে পড়াচ্ছেন। আর সাবরীনা বুকের খাঁচা, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পেয়েছিলেন।
পরিবারটির বেঁচে থাকা সদস্যরা কে কার জন্য শোক করবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না। ছেলে সামিন প্রায় প্রতিদিনই দাদা, বাবা আর বোনের জন্য কাঁদে। সাবরীনার শাশুড়ি হারিয়েছেন স্বামী, ছেলে আর আদরের নাতনিকে। আর ৩৪ বছর বয়সী সাবরীনা তাঁর স্বামী, সন্তান আর শ্বশুরকে হারিয়েছেন।
সাবরীনা বলেন, ‘আমি চিৎকার করে জানতে চাই—ওরা মারা গেছে? দাফন হয়ে গেছে?’ সাবরীনার জ্ঞান ফেরার আগেই তিনজনের দাফন হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনার পর সাবরীনা আর তাঁর ছেলেকে চিকিৎসার জন্য রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন স্বজনেরা। আর শাশুড়ির আঘাত এতটাই খারাপ ছিল যে তখন তাঁকে ঢাকায় আনার মতো পরিস্থিতি ছিল না। দুর্ঘটনার পর পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থল থেকেই বাবা ও ছেলের লাশ উদ্ধার করেন। যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় ছোট সেহেরিশ। মিনোয়ারা বেগমকে ওই হাসপাতালেই ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানো হয়।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ফতেয়াবাদ গ্রামে পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে তিন প্রজন্মের তিনজনের জন্য তিনটি কবর। দাদা আর বাবার মাঝের ছোট কবরটা সেহেরিশের। তবে এসবের কিছুই জানতেন না সাবরীনা।
সাবরীনা বলেন, ‘আমি চিৎকার করে জানতে চাই—ওরা মারা গেছে? দাফন হয়ে গেছে?’ সাবরীনার জ্ঞান ফেরার আগেই তিনজনের দাফন হয়ে গেছে। ব্যবসায়ী হিসেবে শ্বশুর ও স্বামীর সুনাম ছিল এলাকায়। তিনজনের জানাজায় বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন—হোয়াটসঅ্যাপে এমন ছবি পাঠিয়েছেন সাবরীনা।
মৃত স্বামী-সন্তানের চেহারা দেখতে পারেননি সাবরীনা। তাই মনে হতো হয়তো মানুষগুলো বেঁচে আছে। কিন্তু আস্তে আস্তে ভুলটা ভাঙছে, বুঝতে পারছেন আপনজনেরা আর ফিরবে না।
সাবরীনা জানান, চুয়াডাঙ্গায় শাশুড়ির স্কুলের ১০০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান ছিল। ছেলে আর নাতিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। মেয়ে ছোট বলে সাবরীনা যেতে চাননি। এ নিয়ে স্বামী একটু রাগও করেন। তারপর সাবরীনাও গিয়েছিলেন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে।
‘এক বুক হাহাকার নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কোনো কাজই আর শুরু করা হয় না। সবকিছুই স্মৃতিতে আটকে যায়। বাসায় শুধুই শূন্যতা’সাবরীনা জাহান, দুর্ঘটনায় স্বামী, সন্তান ও শ্বশুরকে হারানো নারী
চুয়াডাঙ্গায় আগের দিনই পৌঁছে গিয়েছিলেন সাবরীনার শ্বশুর ও শাশুড়ি। সাবরীনা বলেন, তাঁর স্বামী ভালোই গাড়ি চালাতেন। তবে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে গাড়ি চালাননি। তাই সাবরীনার মনে এ নিয়ে একটু আশঙ্কা ছিল। ২৩ মার্চ ভোরে বাচ্চাদের জন্য নুডলস রান্না করে সাবরীনা ছেলে–মেয়েকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে রওনা দিয়েছিলেন। যাওয়ার পথে সড়কে সাইনবোর্ডে দুর্ঘটনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এমন লেখা দেখে স্বামীকে সাবধানে গাড়ি চালানোর জন্যও বলেছিলেন।
সাবরীনা বলেন, ‘আমাদের দেখে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুব খুশি হয়েছিলেন। মামাশ্বশুর, খালাশাশুড়িদের সঙ্গে অনেক মজা করি। বড় খালাশাশুড়ির বাসায় সবাই পিকনিক করি। সব শেষ হতে হতে রাত ১২টা বেজে যায়। যশোরে ফেরার জন্য রাত সাড়ে ১২টার দিকে আমরা রওনা দিলাম। পথে সবাইকে চা খাওয়ানোর জন্য স্বামী গাড়ি থামান। শ্বশুর নিজের পকেট থেকে টাকা বের করেন ছেলেকে দেওয়ার জন্য। এ নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি। ঈদের (ঈদুল ফিতর) পরপর রাতের বেলায় কোথাও চা পাওয়া যায়নি।’
‘শুধুই শূন্যতা’
সাবরীনার এক ননদ জান্নাতুল ফেরদৌসের বিয়ে হয়েছে। তিনি ঢাকায় থাকেন। যশোরে কাছাকাছি দূরত্বে এক বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি থাকতেন। আরেক ফ্ল্যাটে সাবরীনা স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। দুই বাসায় থাকলেও পরিবারের সবাইকে নিয়ে সাবরীনার সাজানো সংসার ছিল।
সাবরীনা বলেন, ‘আমার সংসার ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। এখন অফুরন্ত অবসর। বাসায় কাজের জন্য সাহায্যকারী থাকলেও আমাকেই রান্না করতে হতো। আমার স্বামী আমার রান্না খুব পছন্দ করতেন। বিয়ের আগে কিছুই রান্না করতে পারতাম না। স্বামীর জন্যই রান্না শিখেছিলাম। এখন সেই রান্নাও করতে হয় না। এক বুক হাহাকার নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কোনো কাজই আর শুরু করা হয় না। সবকিছুই স্মৃতিতে আটকে যায়। বাসায় শুধুই শূন্যতা।’
সাবরীনা বিয়ের পর স্নাতকোত্তর করেছেন। লেখালেখি করেন। অমর একুশে বইমেলায় এখন পর্যন্ত তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। পরিবারের সদস্য বিশেষ করে শ্বশুর তাঁর এই লেখালেখির খুব প্রশংসা করতেন বলে জানান সাবরীনা। সেই লেখালেখিও শুরু করতে পারছেন না তিনি।
সাবরীনা বলেন, ‘নানা বাড়িতে যাওয়ার পর স্বামী কী মনে করে বাবা, মা, খালা, মামা সবাইকে মুখে তুলে তুলে খাইয়ে দেন। আমাকে আর ছেলে–মেয়েকেও খাইয়ে দেন। সবার সামনে এমন কখনো করতেন না। এগুলোই এখন শেষ স্মৃতি।’
‘মানুষের জীবনের গল্প লিখতে লিখতে নিজের জীবনটাই গল্পে পরিণত হয়েছে’—বললেন সাবরীনা। ফেসবুক থেকেও দূরে ছিলেন। আস্তে আস্তে ফেসবুকে নিজের জীবনের, স্বামী ও সন্তানকে নিয়ে নানা স্মৃতির কথা লেখা শুরু করেছেন।
সাবরীনা বলেন, ‘নানাবাড়িতে যাওয়ার পর স্বামী কী মনে করে বাবা, মা, খালা, মামা সবাইকে মুখে তুলে তুলে খাইয়ে দেন। আমাকে আর ছেলে–মেয়েকেও খাইয়ে দেন। সবার সামনে এমন কখনো করতেন না। এগুলোই এখন শেষ স্মৃতি।’
আর্থিক বিষয় নিয়ে সাবরীনা ও তাঁর ছেলেকে হয়তো ভাবতে হবে না। শ্বশুর ও স্বামী যথেষ্ট রেখে গেছেন। তবে সাবরীনা বলেন, ‘ভাগ্যটা এমন জায়গায় ঠেকে গেছে যে চারপাশে আমার সবই আছে, শুধু আপন মানুষগুলোই নেই। পরিবারের সবাই এক টেবিলে বসে খাওয়া, খুনসুটি করা হবে না। এখন আর আমার জীবনে কোনো আনন্দ নেই, কোনো উৎসব নেই। অথচ নিজের জন্মদিন, স্বামীর জন্মদিন বা সবাই মিলে ঘুরতে যাওয়া, জীবনে কোনো কমতি ছিল না।’
২০১০ সালে বিয়ে হয় সাবরীনার। সেদিনের দুর্ঘটনাটি ঠিক কী কারণে ঘটেছিল, তা জানা নেই তাঁর। তবে সাবরীনার মনে হয়, সড়কে শুধু বিপজ্জনক কথাটি লিখে না রেখে অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। যে জায়গায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে উল্টো পাশ থেকে গাড়ি এলেও আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। তিনি শুনেছেন তাঁদের গাড়িটি ডান পাশ থেকে বাঁ পাশে গিয়ে বটগাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল। দুর্ঘটনার পর দ্রুত চেষ্টা করলে মেয়েটাকে হয়তো বাঁচানো যেত। মেয়েটার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দুর্ঘটনার পর ছেলেই ৯৯৯–এ ফোন করে। দুই পরিবারের অন্যদের জানায়।
এই মেয়ে যখন পেটে, তখন সাবরীনা তাঁর প্রথম বই লেখা শুরু করেছিলেন। আবার তিনি সেই লেখালেখিতেই ফিরতে চান। বললেন, ‘শাশুড়ির অবস্থা প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছে। তিনি আমাকে আর আমি তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি। দুর্ঘটনার পর ছেলেই কিছুটা হুঁশে ছিল। ছেলে বলেছে, মারা যাওয়ার আগে তার বাবা পেছনে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। বুঝতে পারছি ছেলের জন্য হলেও আমাকে বাঁচতে হবে।’