দেশে দেশে রমজানে যত প্রথা

রমজানের লন্ঠন হাতে পবিত্র মাসের আগমন উদ্‌যাপন করছে শিশুরা। সম্প্রতি ইরাকের মসুল শহরেছবি: রয়টার্স

‘সাবকো রোজা রাখনে কি য়া আল্লাহ তাওফিক দে, সাবকো নামাজ পাড়নে কি য়া আল্লাহ তাওফিক দে।’ পুরান ঢাকায় পবিত্র রমজান মাসে রাতের শেষ প্রহরে হরহামেশা শোনা যেত এমন সংগীত। এই সংগীতের নাম কাসিদা। সাহ্‌রির আগে মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য কাসিদা গাওয়া হতো। মহল্লায় মহল্লায় ভেসে আসত সংগীতের সুরের মূর্ছনা। দিনগুলো হারিয়ে গেছে।

কাসিদা আরবি শব্দ। অর্থ—প্রশংসা বা প্রশস্তিমূলক কবিতা। ইসলাম ধর্মের প্রথম পর্বেই আরবি সাহিত্যে কাসিদার বড় ভান্ডার গড়ে উঠেছিল। পুরান ঢাকায় এই প্রথার শুরু সেই মোগল আমল থেকে। রোজাদারদের জাগিয়ে তোলার জন্য কাসিদা গাওয়াকে সওয়াবের কাজ মনে করা হতো তখন। ঈদের দিন মহল্লায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নজরানা নিয়ে আসত কাসিদা গায়কের দলগুলো।

সাহ্‌রির আগে রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর চল রয়েছে ভূস্বর্গ কাশ্মীরেও। সেখানে একদল মানুষ ঘুরে বেড়ান পাড়ায় পাড়ায়। বাজনার তালে তালে গলা চড়িয়ে বলতে থাকেন—‘ওয়াক্ত-ই-সাহার’। অর্থাৎ সাহ্‌রির সময় হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে তাঁরা পরিচিত ‘সাহার খান’ নামে। মোবাইল–ইন্টারনেটের আধুনিক যুগে প্রাচীন এই রেওয়াজ এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে।

ঢোল বাজিয়ে রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর প্রথা রয়েছে দিল্লির পুরোনো অংশে। সেখানে এই মানুষগুলো সাহার খান নন, বরং পরিচিত ‘মুনাদি’ নামে। তাঁদের অনেকের পরনে থাকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক—কুর্তা, পাজামা ও টুপি। এ রেওয়াজও কাসিদার মতো চলে আসছে মোগল আমল থেকে। আশির দশকেও দিল্লিতে রমজানের রাতে বহু মুনাদি দেখা যেত। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না।

যাওয়া যাক মিসরে। রাজধানী কায়রোয় ইফতারের সময় জানান দেওয়া হয় কামান দেগে। এর পেছনে মজার এক কাহিনি রয়েছে। ১৫ শতকের কথা। মিসর ছিল মামলুক সালতানাতের অধীন। তৎকালীন সুলতান একটি কামান উপহার পেয়েছিলেন। রমজানের এক সন্ধ্যায় কামানটি দেগে পরখ করতে গিয়েছিলেন তিনি। তোপধ্বনিতে কায়রোবাসী ভেবেছিলেন, ইফতারের সময় হয়েছে।

মানুষের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে সুলতান ভাবলেন, এভাবে তো প্রতিদিনই ইফতারের সময় জানানো যায়। তখন থেকেই মিসরে চলে আসছে প্রথাটি। ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত আসল গোলা দিয়ে কামান দাগা হতো। এর পর থেকে করা হয় শুধু ফাঁকা আওয়াজ। ধীরে ধীরে প্রথাটি ছড়িয়ে পড়ে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, তুরস্ক ও ইরাকে। এরপর উপসাগরীয় অঞ্চল ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশে।

রমজানকে অনেক দেশে সাজসজ্জার মাধ্যমে বরণ করা হয়। রেওয়াজটি চলে আসছে বহু আগে থেকে। এই সজ্জার একটি উপকরণ লন্ঠন। রমজানে কায়রোর দোকানপাট ও ঘরবাড়ি সাজানো হয় লন্ঠন দিয়ে। মনে করা হয়, এর উৎপত্তি মিসরীয় সভ্যতা থেকে।

লন্ঠনের প্রথাটি মিসরের বাইরেও দেখা যায়। গাজায় শত নৃশংসতার মধ্যে ঐতিহ্যের টানে এবারও রমজানে অনেক ফিলিস্তিনি লন্ঠন দিয়ে ঘর সাজিয়েছেন। এ মাসে বাহারি রঙের আলো আর চাঁদ–তারার নকশা নজর কাড়ে আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোয়। আর উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় শত শত বছর ধরে সাজসজ্জায় গুরুত্ব দেওয়া হয় আরব্য শৈলীর নকশাকে।

রমজান ত্যাগের মাস, সম্প্রীতির মাস। এ মাসে আরব দেশগুলোয় মহল্লার সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করার একটি প্রথা রয়েছে। ধনী থেকে দরিদ্র—সবাই অংশ নেন সেখানে। মিসরে এমন ইফতারের আয়োজনে সবাই কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসেন। আর পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সেনেগালের মানুষ তো ‘তেরাঙ্গা’ সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত। এর অর্থ হলো আতিথেয়তা। দেশটিতে নাকি কারও কাছে খাবারের দোকানের ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি রাতে নিজের বাড়িতে খাবারের দাওয়াত দিয়ে বসেন। রমজানে সেনেগালে বেড়ে যায় তেরাঙ্গা সংস্কৃতির চর্চা। দেশটিতে ইফতারকে বলা হয় ‘এনদোগোউ’। একজনও যেন এনদোগোউ থেকে বঞ্চিত না হন, তার আপ্রাণ চেষ্টা থাকে সেনেগালবাসীর। রমজানের সংহতি পূর্ণতা পায় তাঁদের আচারে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, দ্য ন্যাশনাল, প্রথম আলো