ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাস-মিনিবাসের ভাড়া ব্যাপকভাবে বাড়ানোর চাপ দিচ্ছেন পরিবহনমালিকেরা। শুধু জ্বালানির দাম নয়, পরিবহনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে দাবি করে তা যুক্ত করে নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণের দাবি করছেন তাঁরা। তবে পরিবহনমালিকদের দাবি মেনে গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি করা কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে সরকার। এরপর কয়েক দফায় ডিজেলের দাম কমানো হয়। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার দুই দফায় কিলোমিটারপ্রতি বাস-মিনিবাসের ভাড়া ৮ পয়সা কমায়। কিন্তু তা মেনে বাসের ভাড়া কমাননি পরিবহনমালিকেরা। সরকারেরও কোনো তদারকি ছিল না।
গত শনিবার ডিজেলের দাম বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১১৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ লিটারে এক টাকা বেড়েছে। এই এক টাকা বাড়তির জন্য নতুন করে পরিবহনের ভাড়া বেশিহারে বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
দেশের পণ্য ও যাত্রীবাহী পরিবহনের বেশির ভাগই ডিজেলে চলাচল করে। এর মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দেয় না। শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয় (নন-এসি), এমন বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
এর বাইরে যাত্রীবাহী নৌযানও চলাচল করে ডিজেলে। এর মধ্যে নৌপথে ৪২ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন লঞ্চ মালিক সমিতির নেতারা।
এদিকে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকনেতাদের নিয়ে গতকাল রোববার রাতে বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে বৈঠক বসে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, পরিবহনমালিক-শ্রমিকনেতারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বাইরে অন্যান্য খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের জন্য চাপ দেন। অন্যদিকে বিআরটিএ শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির হারে বাসের ভাড়া বৃদ্ধির কথা বলে। কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়।
ভাড়া নির্ধারণ বা বৃদ্ধির সময় পরিবহনের সার্বিক ব্যয় বিশ্লেষণ করে বিআরটিএর একটি কমিটি। এতে পদাধিকারবলে প্রধান হন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান। কমিটিতে আছেন সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা। এর বাইরে পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের তিন থেকে চারজন সদস্য থাকেন। যাত্রীদের স্বার্থ দেখার জন্য কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) একজন প্রতিনিধি থাকলেও তিনি একা হয়ে পড়েন বলে কার্যত কোনো প্রভাব রাখতে পারেন না।
ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস-মিনিবাসের ১২টি বিষয় ও বিনিয়োগ বিবেচনা করে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি। এর মধ্যে বাস কেনার সময়, এর আয়ুষ্কাল, যাত্রী আসন ও আসন অনুযায়ী যাত্রী পাওয়ার হার বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া জ্বালানিসহ পরিচালন ব্যয়ের খাত বিবেচনায় নেওয়া হয় কমবেশি ২০টি বিষয়। ভাড়া নির্ধারণের এ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাস পরিচালনার জন্য যে ব্যয় দেখানো হয়, তার কিছু কিছু ‘আজগুবি ব্যয়’ বলে মনে করার কারণ রয়েছে।
ভাড়া হ্রাস-বৃদ্ধির অতীত
২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম প্রতি লিটার একলাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করেছিল সরকার। এর পরপরই পরিবহনমালিকেরা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়িয়ে দেন। পরে পরিবহনের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
ওই আগস্টে ডিজেলের দাম বাড়ানোর ২৫ দিনের মাথায় তা আবার কমিয়েছিল সরকার। প্রতি লিটারের দাম ৫ টাকা কমিয়ে ১০৯ টাকা করা হয় ২৯ আগস্ট। এরপর ১ সেপ্টেম্বর ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া ৫ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সরকার। কিন্তু তা মানেননি পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা।
দুই বছর পর ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আরও ৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১০৬ টাকা। সেদিন পরিবহনের ভাড়া ৩ পয়সা কমানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
তার আগে বাসভাড়া ২০১৬ সালে ৩ পয়সা এবং ২০১১ সালেও ২ পয়সা কমানো হয়েছিল। কিন্তু পরিবহনমালিকেরা সেটাও মানেননি।
পরিবহন খাতের সূত্রগুলো বলছে, বাসের ক্ষেত্রে বিআরটিএ প্রথমে ‘আজগুবি ব্যয়’ যুক্ত করে বাড়তি ভাড়া নির্ধারণ করে। আবার পরিবহনে নির্ধারিত ওই ভাড়ার চেয়ে বাড়তি আদায় করা হয়।
যেমন ঢাকার ফার্মগেট থেকে সাভারের দূরত্ব ১৯ দশমিক ৬ কিলোমিটার। এই পথের ওয়েলকাম, লাব্বায়েক ও লাভলী পরিবহনে এই গন্তব্যের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। এমনকি সাভার বাসস্ট্যান্ডের তিন থেকে চার কিলোমিটার আগে নেমে গেলেও একই ভাড়া নেওয়া হয়।
২০২২ সালে বাসের জন্য কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল আড়াই টাকা। সেই হিসাবে ফার্মগেট থেকে সাভারের ভাড়া ৪৯ টাকা। অর্থাৎ তখন থেকেই এক টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এরপর কিলোমিটার প্রতি দুই দফায় ভাড়া ৮ পয়সা কমেছে। সে হিসেবে ভাড়া হওয়ার কথা ৪৭ টাকা।
ঢাকার পরিবহনে অধিকাংশ যাত্রী স্বল্প দূরত্বে যাতায়াত করেন। ঢাকার বাসে উঠলেই ১০ টাকা গুনতে হয়। সর্বনিম্ন এই ভাড়া সরকার নির্ধারিত। এখানে পরিবহনমালিকদের লাভ বেশি হয়।
আবার দূরের পথেও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা। আর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মহানগরগুলোয় বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৪২ পয়সা। মহানগরে মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৩২ পয়সা।
‘আজগুবি ব্যয়’
বিআরটিএর সর্বশেষ বাসভাড়া নির্ধারণের ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মহানগরে চলাচল করে—এমন একটি নতুন বাসের দাম ৩৫ লাখ টাকা। এটি ১০ বছর চলবে বলে ধরে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রতি পাঁচ বছরে একবার এসব বাস নতুন করে সংস্কার (রেনোভেশন) করা হবে। এতে ব্যয় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এসব ধরেই বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
অথচ ঢাকায় ৩৫ লাখ টাকা দামের নতুন বাস চোখে কমই পড়ে। বাস-মিনিবাস মানেই রংচটা, লক্কড়ঝক্কড় অবস্থা, ময়লা-ছেঁড়া আসন। আরেকটি সাংঘর্ষিক বিষয় হচ্ছে, সরকার আইন করেছে, একটি বাস-মিনিবাস ঢাকায় ২০ বছর পর্যন্ত চলতে পারবে। অথচ ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে ১০ বছর ধরে। অর্থাৎ ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী বাসেও নতুনের মতো একই ভাড়া আদায় করা যাবে।
ভাড়া নির্ধারণের সময় বলা হয়েছে, বাসগুলো প্রতি ২৫ দিনে এবং ৩ মাসে মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। এর জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ঢাকার বাসগুলোর পেছনে এমন ব্যয় করা হচ্ছে, তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
নগর পরিবহনের বাস গ্যারেজ ও টার্মিনালে রাখার জন্য আলাদা ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু ঢাকার কোনো বাসের জন্য আলাদা গ্যারেজ নেই। সড়কের পাশেই থাকে এসব বাস।
এক বছর পরপর ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের (বড় ধরনের মেরামত) জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে।
পরিবহনের চালক, চালকের দুই সহকারীর মাসিক বেতন এবং উৎসবে দুবার বোনাস ধরা হয়েছে বাসভাড়া নির্ধারণের ব্যয় বিশ্লেষণে। অথচ এমন বোনাস তাঁরা পান, এমন কোনো তথ্য পরিবহনশ্রমিকদের কাছে পাওয়া যায়নি। আর মাসিক বেতনের প্রচলনও নেই বললেই চলে।