শাহ আবদুল করিমের সেই জন্মদিন
বড় দুর্গম ছিল রাস্তা। বরাম হাওরের বুক চিরে তখনো পাকা সড়ক হয়নি। বোরো খেতের ফাঁক দিয়ে আলপথ মাড়িয়ে আর আঁকাবাঁকা এক রাস্তা ধরে কিছুটা হেঁটে, কিছুটা ট্রাক্টরে চেপে তবেই সবুজ-শ্যামল উজানধল গ্রাম। কালনী নদীর কূলের এ গ্রামে অবশ্য নৌপথেও আসা যায়।
এক বসন্ত দিনে, ২০০৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সেই উজানধলের উদ্দেশে সড়কপথে রওনা হই। সুনামগঞ্জের হাওর-অধ্যুষিত দিরাই উপজেলার এ গ্রামেই বাউলসাধক শাহ আবদুল করিমের বাড়ি। সেই করিম, যিনি অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা ও শিল্পী। পরদিন তাঁর নবতিতম জন্মবার্ষিকী। সে কারণেই করিম-তনয় শাহ নূরজালাল ভাইয়ের সঙ্গে মুঠোফোনে আগেই যোগাযোগ করে মিষ্টি, পোশাক, ফুল, ব্যানার নিয়ে উজানধলে হাজির হই।
আবদুল করিমের বাড়িতে যখন পৌঁছাই, তখন সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। গৃহ বলতে আধা পাকা দুই কক্ষের এক ঘর আর সামনে বারান্দা। এক কক্ষে থাকেন আবদুল করিম। অন্য কক্ষটিতে নূরজালাল স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে থাকেন। আমার রাতযাপনের ঠাঁই হয় আবদুল করিমের কক্ষে, তাঁর চৌকির বিপরীতে পৃথক আরেক চৌকিতে।
রাতের খাওয়া শেষে নূরজালাল ভাইয়ের পিছু পিছু বাড়ির পূর্ব পাশে নির্মিতব্য শাহ আবদুল করিম সংগীতালয়ে যাই। সেখানে বসে গানের মজমা। ভোররাত পর্যন্ত চলে। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না, চলে না’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’, ‘মুর্শিদ ধন হে’, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু’, ‘আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’-সহ অসংখ্য গান গেয়ে শোনান শিল্পীরা। ওই রাতের জলসায় বাউলশিল্পী আবদুর রহমান, রণেশ ঠাকুরসহ আবদুল করিমের অনেক শিষ্য ছিলেন।
গানের জলসা দ্রুতই জমে ওঠে। হারমোনিয়াম, ঢোল, বেহালা আর বাঁশির সুর যখন সংগীতালয় ছাপিয়ে আকাশেও ঢেউ তোলে, এমনই এক মুহূর্তে মজমায় যোগ দেন শাহ আবদুল করিমও। শিল্পীরা মেঝেতে পাতা ত্রিপলে বসে গান গাইছেন, আমাদের কেউ কেউ ভেতরে থাকা একটা চৌকিতে বসা। পাশেই ঘরের এক কোণে একটা কাঠের চেয়ারে বসে শিষ্যদের সঙ্গে আবদুল করিমও গলা মেলালেন, গাইলেন তাঁর প্রিয় সব গান। হাতে থাকা ইয়াশিকা ক্যামেরায় একের পর এক তুলতে থাকি ছবি।
শেষরাতে জলসা শেষ হয়। সবাই যার যার মতো করে বাড়ি ফেরেন। দূরের শিষ্য-ভক্তরা থেকে যান সংগীতালয়েই। নূরজালাল ভাইয়ের সঙ্গে পরদিনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা সাজাই। আবদুল করিমের জন্মদিন এই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হচ্ছে, এর উচ্ছ্বাস আমাদের চোখেমুখে।
শাহ আবদুল করিম জন্ম নেন ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ২০০৬ সালে ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর জন্মদিন উদ্যাপিত হয়। আগের রাতে গানের জলসার পর জন্মবার্ষিকীর ব্যানার সাঁটিয়ে, সব প্রস্তুতি শেষে আমরা ঘুমোতে যাই। দুপুরে ঘুম থেকে উঠে শুরু হয় তোড়জোড়। ততক্ষণে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কেক, ফুল নিয়ে হাজির। শাহ আবদুল করিমকে পরানো হয় তাঁরই ঘনিষ্ঠজন কবি শুভেন্দু ইমামের পাঠানো পাঞ্জাবি-পায়জামা।
বিকেলের অনুষ্ঠানে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে।’