কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে

একশনএইডের আয়োজনে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের একটি সেশনে বক্তাদের একাংশ। ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ছবি: আয়োজকদের সৌজন্যে

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন যে পরিমাণ পানির চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে, তাতে স্থানীয় লোকজনের জন্য পানির সংকট তৈরি করার পাশাপাশি বাংলাদেশের পানির নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদী ও সমুদ্রের জলজ বাস্তুতন্ত্র। বুধবার একশনএইড আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের একটি সেশনে উপস্থাপিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

এ সেশনে ‘ওয়াটার ফর পাওয়ার, নট ফর পিপল? হাউ কোল-বেইজড পাওয়ার প্ল্যান্ট রিশেপিং দ্য ওয়াটার সিকিউরিটি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে পানির নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে, তা তুলে ধরেন একশনএইড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (জাস্ট ট্রানজিশন) মো. আবুল কালাম আজাদ।

আবুল কালাম আজাদ তাঁর গবেষণায় চারটি কেস স্টাডি হাজির করে দেখান যে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১ হাজার ৫০০ লিটার থেকে ২ হাজার ৫০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ৪৭ লাখ লিটার পানির প্রয়োজন হয়, যা ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষের চাহিদা পূরণ করার সমান। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণে আন্ধারমানিক ও গলাচিপা নদীতে ইলিশের প্রজনন সংকটের মুখে পড়েছে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিবছর পশুর নদ থেকে ২৩ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন গ্যালন পানি তুলে নেয়, যা প্রায় ৯ হাজার কোটি লিটারের সমান। প্রায় ৫ হাজার কোটি লিটার পানি পশুর নদে দূষিত অবস্থায় ছেড়ে দেয়, যা পশুর নদ হয়ে সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করে। যে পরিমাণ পানি তুলে নেওয়া হচ্ছে, তাতে নদের স্বাভাবিক প্রবাহ কমে আসছে, যা স্থানীয় লোকজনের জন্য সংকট তৈরি করবে।

এ ছাড়া প্রতিবছর এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ফ্লাই অ্যাশ (ভাসমান ছাই) ৭ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টন, যা মাটি, পানি ও সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করছে বলে গবেষণায় তুলে ধরেন আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। সেসব জায়গায় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা মানে সে সংকটকে আরও ভয়াবহতার দিকে ঠেলে দেওয়া। এসব কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ধীরে ধীরে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।

একশনএইড বাংলাদেশ ২০১৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক এ পানি সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। ‘রিইমাজিনিং ওয়াটার গভর্ন্যান্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ফিউচার’ শিরোনামে এবারের ১১তম সম্মেলন আয়োজন করা হচ্ছে। লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের গান দিয়ে বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে সম্মেলনের উদ্বোধন হয়।

উদ্বোধনী বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, এটি খুবই উদ্দীপনার বিষয় যে এ সম্মেলনে পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে অনেকে অনলাইনে অংশ নিচ্ছেন। ২০২৫ সালে দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ হিসেবে জাতিসংঘের পানি কনভেনশন ১৯৯২ স্বাক্ষর করেছে। এটি একটি মাইলফলক। টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানির সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

উপকূলের নারীদের উদাহরণ দিয়ে ফারাহ কবির বলেন, ‘উপকূলীয় গ্রামে একবার এক নারী আমাকে বলেছিলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পানিই আমাদের দিন কীভাবে যাবে, সেটা নির্ধারণ করে দেয়। পুকুরের পানি লবণাক্ত হয়ে গেলে, বন্যা হলে তাদের মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় সুপেয় পানি সংগ্রহ করার জন্য। এ সম্মেলন তাদেরই হয়ে কথা বলবে।’

সম্মেলনে প্রথম অধিবেশনে ‘রিইমাজিনিং ওয়াটার গভর্ন্যান্স ফর জাস্টিস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ফিউচার’–এর ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও সেন্টার ফর অলটারনেটিভসের নির্বাহী পরিচালক ইমতিয়াজ আহমদ। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু পানি ব্যবহারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন একজন মানুষ প্রায় আট হাজার লিটার পানি ব্যবহার করেন। সেখানে বাংলাদেশে ব্যবহার অনেক কম। তাই বৈশ্বিক পর্যায়ে একটা ওয়াটার গভর্ন্যান্স থাকা উচিত। জাতীয় পর্যায়েও পানির ব্যবহার নিয়ে এখানে অব্যবস্থাপনা আছে। উন্নত দেশের কার্বন নিঃসরণ বাংলাদেশের পানিসংকটকে ত্বরান্বিত করবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাসফিকুস সালেহিন বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে যত কৌশল আমরা নিচ্ছি তাতে কে উপকৃত হচ্ছে, সেটা আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের অভিমত, মতামতের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পানির নিরাপত্তা ও নীতি গড়ে উঠতে হবে। এটা বাংলাদেশ নিয়ে যে ডেলটা প্ল্যান সেটাতে হয়নি। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায়ও এটা হয়নি।’

সম্মেলনের থিমেটিক সেশনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ভূগোল বিভাগ থেকে একটি প্রবন্ধ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।