অদূর ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা ‘অসাংবিধানিক ও বেআইনি’ মনে না করলেও অদূর ভবিষ্যতে আরও একটি ‘গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য’ নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। তাঁরা মনে করেন, ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের পরও বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ থাকবে এবং তেমন হলে অদূর ভবিষ্যতে আরও বেশি দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আরেকটি নির্বাচন হতে পারে।
সাবেক এই কূটনীতিকেরা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোট না করিয়ে ক্ষমতাসীন দলের উপায় ছিল না। কারও ধারণা, এই নির্বাচন অসাংবিধানিক বা বেআইনি না হলেও সর্বগ্রাহ্য হতে পারবে না। কেউ বা মনে করেন, প্রধান বিরোধী দল ভোটে না দাঁড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রায় সবাই অদূর ভবিষ্যতে আরও একবার নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন।
প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে দেব মুখার্জি ও পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী এ নির্বাচনকে সম্পূর্ণভাবে ‘সাংবিধানিক ও আইনসংগত’ বলে মত দেন। দেব মুখার্জি বলেন, এ ভোট করা ছাড়া আর কোনো পথ সরকারের কাছে খোলা ছিল না। সরকার তার মতো করে অনেক চেষ্টা করেছে, সফল হয়নি। অন্যরা নির্বাচনে অংশ নিলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত।
একই সুরে পিনাকরঞ্জন বলেন, সাংবিধানিক ও আইনগত দিক থেকে এ নির্বাচনকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাতে কেউ পারবে না। তাই পরবর্তী সরকার গঠিত হবে, হিংসাও অব্যাহত থাকবে, সরকারও তার মোকাবিলা করবে। খালেদা জিয়া ও জামায়াতকে জমি ছাড়তে শেখ হাসিনা রাজি নন, এটা পরিষ্কার। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে অদূর ভবিষ্যতে আরও একবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাই এমন ধারণা সৃষ্টি করেছেন বলে দেব মুখার্জি, মুচকুন্দ দুবে ও বীণা সিক্রির অভিমত। মুচকুন্দ দুবের মতে, এখন আর হাসিনার থামার প্রশ্ন নেই। কিন্তু এই নির্বাচনের ফল গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বস্ত হবে না। তাই আরও একটি সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনের অবকাশ থেকে যাচ্ছে। তবে তার জন্য যে সংলাপ প্রয়োজন, সেই প্রক্রিয়ায় বিরোধীদের অংশ নিতে হবে।
সংলাপে অংশ না নিয়ে বিরোধীরা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছেন বলে মনে করেন বীণা সিক্রি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, খালেদার বড় ভুল ভোট বর্জন করা। কারণ, ভোটে তাঁদের জেতার সম্ভাবনাই ছিল বেশি। তাঁদের উচিত, সংলাপে অংশ নিয়ে পরের ভোটকে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
ভোট-পরবর্তী কয়েকটি মাস বাংলাদেশের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে সাবেক এই কূটনীতিকদের অভিমত। তাঁরা মনে করেন, অবিলম্বে হিংসার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নমুখী করে রাখা জরুরি।
মুচকুন্দ দুবে মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়া অনেক আগ্রহ দেখিয়েছে ঠিকই কিন্তু তারা কেউই হিংসা বন্ধে জোর দেয়নি। তারা সবার অংশগ্রহণে ভোট করাতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। এতে দেশে হিংসার প্রকোপ বেড়ে গেল, ভোটও সর্বজনগ্রাহ্য হলো না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া, জামায়াত ও হেফাজতকে নিয়ে ভারতের খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই। কারণ, বাংলাদেশের জনগণ কখনো দেশকে তালেবানপন্থীদের হাতে তুলে দেবে না।
বীণা সিক্রির ধারণা, বিএনপির ভোটবিরোধিতা ও জামায়াতের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের বিরোধিতাকে একই আলোয় দেখতে হবে। জামায়াতের প্রভাব থেকে বিএনপিকে মুক্ত করাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় একই মনোভাব দেব মুখার্জির। তিনি বলেন, দুঃখের বিষয়, জামায়াতিদের সুবিধা করে দিতে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল ভোটে অংশ না নেওয়ার অনমনীয় মনোভাব নিয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকেরা মনে করেন, অধিকাংশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোট করার ক্ষেত্রে ভারত তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। লাভ হয়নি। এটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু অশান্ত বাংলাদেশ ভারতের কাম্য নয়। একমাত্র গণতন্ত্রী, উন্নয়নশীল ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশই ভারতকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখতে পারে।