অর্ধেক খুনের মামলার রহস্য বের করতে পারেনি পুলিশ
ঢাকা মহানগরে এক যুগে সংঘটিত খুনের প্রায় অর্ধেক মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্তে দুর্বলতাই এর প্রধান কারণ। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অপরাধের ধরনের কারণেই অনেক তদন্ত এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির পরিচয় না মেলার কারণে অপরাধকারীকে শনাক্ত করা যায় না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের (প্রসিকিউশন) নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ১২ বছরে ১ হাজার ৮৮টি খুনের মামলার তদন্ত শেষে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে (সিএমএম) প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫৮৬টি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। আর ৫০২টি হত্যার খুনিদের চিহ্নিত করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। শতকরা হিসাবে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের হার ৪৬ ভাগ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খুনের যেসব মামলার বাদী পুলিশ নিজে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেসব মামলার রহস্যের জট খোলেনি। এর কারণ নিহত ব্যক্তির পরিচয়-ঠিকানা উদ্ধার হয়নি। আবার হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে না পারার কারণেও আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। তবে বেশ কিছু মামলার সুনির্দিষ্ট বাদী থাকা সত্ত্বেও তদন্ত পরিণতি পায়নি। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাদী আপত্তি তুলে আবার তদন্তের আবেদন করেছেন।
এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলায় পুলিশের ব্যর্থতা নেই, তা বলা যাবে না। পুলিশের কিছু দুর্বলতা আছে। তবে আন্তরিকতার অভাব নেই। পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ খুনের মামলার রহস্য উদ্ঘাটিত হয় না। তিনি বলেন, অনেক সময় লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারার কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে হয়। অনেক সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও অনেকে খুনের মামলা করেন। আবার তদন্ত চলাকালীন অনেক সময় বাদী আর আসামিপক্ষ আপসে এসে তদন্ত নস্যাৎ করে দেন।
মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আততায়ীরা ফাল্গুনী পরিবহনের তত্ত্বাবধায়ক খলিলুর রহমানকে চকবাজার থানাধীন ৮৭/১ হরনাথ ঘোষ রোডে কুপিয়ে হত্যা করে। পুলিশ খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি। গত ১৩ জানুয়ারি এ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। খলিলুলের ছেলে মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, তিন বছর হলো অথচ পুলিশ খুনিকে খুঁজে বের করতে পারল না। এ ব্যাপারে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম রশিদ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘থানায় নতুন এসেছি। খোঁজ নিয়ে দেখব।’
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় অর্ধেকসংখ্যক খুনের মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এ দেশে পুলিশের তদন্তে গাফিলতি থাকে। থাকে তত্ত্বাবধানের অভাব। পুলিশের কাজের চাপের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। খুনের মামলার বাদী রাষ্ট্র। তাই রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বেশির ভাগেরই বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন জমা পড়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে। সবগুলোতেই আসামিদের মাধ্যমে পুলিশের প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। ২০১২ সালের ১৭ আগস্ট দারুস সালাম এলাকায় নাঈম নামে পাঁচ বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটির বাবা হত্যা মামলা করলেও ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেননি নিহত শিশুর বাবা। বাদীর আইনজীবী হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শিশু নাঈমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। অথচ পুলিশ আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
২০১২ সালের ২৬ অক্টোবর বনানী থানাধীন চেয়ারম্যানবাড়ীর সেতু ভবনের কাছে এক ব্যক্তিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তিন বছর তদন্ত করেও খুনিকে চিহ্নিত করতে না পেরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু খুনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় বের করা যায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়া রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে ফৌজদারি অপরাধের যে বিচারব্যবস্থা রয়েছে, তা দিয়ে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো জবাবদিহি নেই। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এর বিকল্প পথ খোলা নেই।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, সারা দুনিয়ায় পুলিশের সাফল্যের হারের তুলনায় এ দেশে অপরাধ তদন্তে পুলিশের সাফল্য অস্বাভাবিক রকম কম। অর্ধেকের বেশি কিছু মামলায় অভিযোগপত্র হলেও সেগুলোর মাত্র ২০ শতাংশ মামলায় শেষ পর্যন্ত খুনির অপরাধ প্রমাণ হয়ে শাস্তি হয়।