অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণে অনিশ্চয়তা

শেষের পাতা

অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। কারণ, সম্পত্তির তালিকা তৈরির কাজই শেষ হচ্ছে না। এখনো নতুন নতুন সম্পত্তি অবৈধভাবে অর্পিত হিসেবে তালিকাভুক্ত ও গেজেটে প্রকাশিত হচ্ছে। ফলে ছয় লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও প্রত্যর্পণের আবেদন শেষ হচ্ছে না।

সরকার একাধিকবার আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়েছে। সর্বশেষ তা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রত্যর্পণ আইনটিও এর মধ্যে তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু আইনটির প্রয়োগে জটিলতার নিরসন হয়নি।

সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এ অবস্থায় মামলা নিয়ে ঘরে ঘরে উদ্বিগ্ন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের উদ্বেগের কারণ, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এসব জমির হস্তান্তর ও উন্নয়ন বন্ধ থাকবে। এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চললেও ছয় লক্ষাধিক মামলা নিষ্পত্তি হতে বহু বছর লেগে যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও ভুক্তভোগীদের অভিমত, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনটি আবার সংশোধন করে প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া থেকে খ তফসিলভুক্ত এবং ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের পর তালিকাভুক্ত সম্পত্তি বাদ দেওয়া হলে প্রক্রিয়াটি সহজ ও সফল হতে পারে।

এ সম্পর্কে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ঈদুল ফিতরের আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজ্ঞেরও অভিমত, প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া থেকে খ তফসিলভুক্ত এবং ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের পর তালিকাভুক্ত সম্পত্তি বাদ দেওয়া যায়। তিনি বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখবেন এবং বিষয়টি নিয়ে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিমের সঙ্গে যৌথ সভায় বসবেন বলেও জানান।

কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগের খবর আইন কিংবা ভূমি মন্ত্রণালয় জানাতে পারেনি। তবে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে গত সপ্তাহে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

খ তফসিল নিয়ে প্রশ্ন: অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় খ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি কখনোই সরকারের কাছে ন্যস্ত হয়নি। সে হিসেবে এই সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না এবং এই সম্পত্তি সরকারিভাবে প্রত্যর্পণযোগ্য কি না, তা নিয়ে সব সময়ই প্রশ্ন ছিল। অথচ এখন পর্যন্ত প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়ার অধীনে যেসব সম্পত্তি আনা হয়েছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশ এই শ্রেণীর।

এই শ্রেণীর সম্পত্তির বেশির ভাগই বিভিন্ন সময় তহশিলদারেরা অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় যুক্ত করেছেন। এর মধ্যে কিছু সম্পত্তি মূল মালিকের দখলেই আছে। কিছু হস্তান্তর হয়েছে। কিছু আংশিকভাবে হস্তান্তর হয়েছে। কিছু বেদখলও হয়েছে। এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও চলছে।

আইনজ্ঞদের অভিমত, এই শ্রেণীর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ মীমাংসার জন্য প্রচলিত দেওয়ানি আদালত রয়েছে। সেখানেই এসব সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারিত হবে। এই সম্পত্তি প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখলে মামলার সংখ্যা এত বেশি হবে যে তা দীর্ঘকালেও নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে না।

ডেটলাইন ২৩ মার্চ ১৯৭৪: ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ওই দিন থেকে আর কোনো সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না। করা হলেও তা বৈধ হবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জিয়াউর রহমানের আমলে আবার অর্পিত সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করা শুরু হয়। এরপর এরশাদের আমলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও তালিকাভুক্ত করা শুরু হয়। সেই ধারা এখনো চলছে।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট অন্য মামলার রায়ে সামরিক আইনের অধীনে সামরিক শাসকদের জারি করা সব আদেশ অবৈধ ঘোষণা করায় ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চের রায়ই কার্যকর রয়েছে। অথচ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়ায় খ তফসিলের সব সম্পত্তি ওই তারিখের পর অর্পিত তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই দিক দিয়েও খ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

এ ছাড়া ক তফসিলের মধ্যেও অনেক সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ওই তারিখের পর। সরকারি গেজেটে সেসব তারিখের উল্লেখও রয়েছে। তবে এখন যেসব সম্পত্তি নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে সেখানে আর তারিখ উল্লেখ করা হচ্ছে না।

সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলো জানায়, খ তফসিলের পুরো সম্পত্তি এবং ক তফসিলের ওই তারিখের পরে তালিকাভুক্ত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হলে আর কোনো জটিলতা থাকে না। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে খুব দ্রুতই এ কাজটি হতে পারে। এরপর ক তফসিলভুক্ত যে সম্পত্তি থাকে তার প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব।

ছড়াচ্ছে দুর্নীতি: যুগ যুগ ধরে ভূমি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা দুর্নীতি আরও ছড়িয়ে পড়েছে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর। এ-বিষয়ক অভিজ্ঞতা ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত বলেন, তহশিলদারেরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে টাকা নিচ্ছেন। টাকা না দিলে তাঁরা যেকোনো সম্পত্তির বালাম বইয়ের এক কোনায় পেনসিল দিয়ে ভিপি (ভেস্টেড প্রোপার্টি বা অর্পিত সম্পত্তি) লিখে রাখলেই তা সরকারি তালিকায় উঠে যায়। তাই মানুষ ভয়ে তাঁদের টাকা দিচ্ছেন।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর উদ্ভূত এই পরিস্থিতিকে আইনজীবীরা মনে করছেন ইলিশের মৌসুম। এখন যত পারো ইলিশ ধরো আর খাও। প্রত্যর্পণের এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে অসংখ্য পরিবার এদের হাতে নিঃস্ব হয়ে যাবে।