অশনিতে উত্তাল কক্সবাজার উপকূল, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত ১০,৮০০ স্বেচ্ছাসেবী
ঘূর্ণিঝড় অশনি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের কাছাকাছি অবস্থান করলেও এর প্রভাব পড়েছে ১ হাজার ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণের কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে। সমুদ্রের জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ছে। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে থেমে থেমে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আকাশ মেঘলা, বেলা দুইটা পর্যন্ত সূর্যের দেখা নেই। অশনির প্রভাবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে উপকূলের ঘরবাড়ি, ফসল ও মৎস্য খামারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় অশনি কক্সবাজার থেকে ১ হাজার ১৪০ কিলোমিটার উত্তরে ভারতে অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে, তা বিকেল নাগাদ জানা যাবে। তারপরও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস কিংবা দুর্যোগ হতে পারে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে। ইতিমধ্যে জেলার ৯টি উপজেলার ৫৭৬টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। কুতুবদিয়া, মহেশখালী, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, টেকনাফসহ উপকূলীয় এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনার জন্য ১০ হাজার ৮০০ জন স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৮৪টি মেডিকেল টিম। তা ছাড়া প্রতিটি শেল্টারে (আশ্রয়কেন্দ্রে) আশ্রিত এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের জন্য প্রয়োজনীয় শুকনা খাবার, খাওয়ার পানি মজুতের নির্দেশনা দেওয়া আছে।
জেলার কোথাও ভাঙা বেড়িবাঁধ নেই দাবি করে জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর এখন প্রচণ্ড উত্তাল হলেও বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনাপানি ঢুকে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে জলোচ্ছ্বাস হলে; অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা ৮-১০ ফুট বৃদ্ধি পেলে তখন বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে সাগরের পানি ঢুকে পড়তে পারে।
কক্সবাজার উপকূলকে ২ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
উপকূলজুড়ে জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা
দেশের মানচিত্রের সর্বদক্ষিণে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ। দ্বীপের তিন দিকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর। দ্বীপের ৪৫ হাজার মানুষের জীবন রক্ষায় সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) শতকোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করে ১৮ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নামে স্থায়ী বেড়িবাঁধ। শাহপরীর দ্বীপের উত্তরে নাফ নদীর তীরে পাঁচ শতাধিক জেলে পরিবারের গ্রাম জালিয়াপাড়া। জলোচ্ছ্বাসে ইতিমধ্যে সব পরিবার গৃহহীন হলেও বাঁধের বাইরে (দক্ষিণ দিকে) রয়ে গেছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বহুতল ভবন স্থাপনা। অশনির প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে জালিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে আছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন স্থানীয় ইউপি (সাবরাং) সদস্য আবদুস সালাম।
কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র এবং ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর শাহেনা আকতার বলেন, জলোচ্ছ্বাস হলে ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টির বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। বেড়িবাঁধ না থাকায় সহজে সমুদ্রের লোনাপানি ৭০ হাজারের বেশি শ্রমজীবী মানুষের বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দ্বীপের চারপাশে ১৮ কিলোমিটারের মতো ভাঙা বেড়িবাঁধ ছিল। সম্প্রতি সব বাঁধ সংস্কার হয়েছে। অশনির প্রভাবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হলে বেড়িবাঁধ ভেঙে কিংবা বাঁধ উপচে লোনাপানি লোকালয়ে ঢুকে পড়তে পারে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
ঝুঁকি নিয়ে পর্যটকদের গোসল
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা। কক্সবাজার সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে নেমে দেখা গেছে, কয়েক হাজার পর্যটক উত্তাল সমুদ্রে নেমে গোসলে ব্যস্ত।
সকাল আটটা থেকে সাগরে জোয়ার চলছে। তার ওপর অশনির প্রভাবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে পড়েছে। ঢেউগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ-ছয় ফুট উচ্চতায় বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আছড়ে পড়ছে। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে টায়ার টিউবে গা ভাসিয়ে পর্যটকেরা মজা নিলেও যেকোনো মুহূর্তে বিপদ হতে পারে।
লাইফগার্ডের কর্মীরা বলছেন, ২ মে সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী পয়েন্টের চার কিলোমিটারে পাঁচ-ছয়টি গুপ্তখাল সৃষ্টি হয়েছে। খালগুলো এখনো রয়ে গেছে। ভাটার সময় পানি নেমে গেলে দুটি গুপ্তখাল দৃশ্যমান হয়। অন্যগুলো সব সময় পানির নিচে ডুবে থাকে। গুপ্তখালে আটকা পড়লে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার উপায় নেই।