অস্থায়ীদের কাছে জিম্মি স্থায়ীরা

পুরান ঢাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন ঠাটারীবাজারের পাশের রাস্তায় জেঁকে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। বাজারের সামনের বনগ্রাম ও কাপ্তান বাজারে রাস্তার উভয় পাশ দখল করে বসে শ-খানেক দোকান। এতে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ায় চলাচলে অসুবিধায় পড়েন পথচারীরা।
সিটি করপোরেশনের এই বাজারে পাওয়া যায় এমন সব পণ্যই ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে বিক্রি হয়। বাজারের দোকানিদের অভিযোগ, রাস্তার দোকানগুলোর কারণে ক্রেতাসংকটে ভোগেন তাঁরা। আর ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে স্থানীয় কাউন্সিলর আবু আহমেদ মন্নাফীর লোকজন ও ওয়ারী থানার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে।
বাজারের দোকানিরা বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। আর ডিএসসিসির কর্মকর্তাদেরও অভিযোগ, পুলিশ টাকা নিয়ে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসার সুযোগ করে দিচ্ছে।
ঠাটারীবাজারে প্রায় সাড়ে আট শ দোকান রয়েছে। অধিকাংশ দোকানই সবজি, মাছ-মাংস এবং মুদি দোকান। মার্কেটে যাওয়ার চারটি রাস্তার মধ্যে দুটিতে বসে ভ্রাম্যমাণ বাজার। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাপ্তান বাজার ও বনগ্রাম রোডের উভয় পাশে বসেছে সবজি, মাছ-মাংস ও নিত্যপণ্যের ভ্রাম্যমাণ দোকান। এর মধ্যে কাপ্তান বাজারে এক পাশ দখল করে ভ্রাম্যমাণ দোকান আছে প্রায় ৫০ টি। আর বনগ্রাম রোডের উভয় পাশে দোকান বসেছে ৪০-৪৫ টি। প্রায় দুই বছর ধরে এই দোকানগুলো বসছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা বলেন, রাস্তার ওপর দোকান চালাতে চাঁদা দিতে হয় এলাকায় টহল দেওয়া পুলিশ সদস্যদের। বনগ্রাম রোডের বনগ্রাম লেনের এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দোকান চালানোর জন্য দিনে ২০ থেকে ৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। যখন যে পুলিশ সদস্য টহল দেন, তখন তাঁকে টাকা দিতে হয়। কাপ্তান বাজারের এক হকার বলেন, টাকা দিলে সব বৈধ হয়ে যায়।
ওয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের জন্য একটি টহল দল করে দিয়েছেন তিনি। তারা নিয়মিত অভিযান চালায়। পুলিশের সদস্যদের চাঁদা আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম এই দোষ আমার ওপরই আসবে। কিন্তু সত্য হলো, এসব বাজারের পেছনে রাজনৈতিক নেতারা জড়িত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, কাউন্সিলরের অনুমিত না থাকলে রাস্তায় দোকান বসে কীভাবে? এই এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলো থেকে স্থানীয় কাউন্সিলর আবু আহমেদ মন্নাফীর লোকজন চাঁদা আদায় করেন।
তবে ডিএসসিসির ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবু আহমেদ মন্নাফী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত নন। কেউ এমন অভিযোগের প্রমাণও দিতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘দোকান উচ্ছেদের জন্য আমি নিজে অনেকবার মেয়রকে বলেছি। আমার লোকজন কেউ এমন করলে আমি মেয়রকে বলতাম না।’
মার্কেটের পাশের ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদের দাবিতে ৮ এপ্রিল ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের কাছে চিঠিও দিয়েছে দোকানমালিকদের সংগঠন কাপ্তানবাজার (ঠাটারীবাজার) ব্যবসায়ী দোকান মালিক সমিতি। তাদের দাবি, ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর কারণে মার্কেটের দোকানগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। তাই উচ্ছেদ অভিযান না চালালে নগর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও পরে মার্কেট বন্ধ রাখার কর্মসূচিও পালন করবে তারা।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান খান বলেন, ‘গত মাসে কাপ্তানবাজারে জনতার মুখোমুখি জনপ্রতিনিধি অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির মেয়র চার দিনের মধ্যে দোকান ভ্রাম্যমাণ উচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মাসখানেক পার হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের ভিড় কম। অল্পসংখ্যক ক্রেতা থাকায় দোকানিরা নিজ দোকান থেকে পণ্য কেনার জন্য ডাকছেন। মার্কেটের মাছ দোকানি সরোজ ঘোষ বলেন, কয়েক বছর আগেও মার্কেটের এ অবস্থা ছিল না। রাত ১১-১২টা পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত। এখন সারা দিন ডেকেও ক্রেতা পাওয়া যায় না। পাশের অপর এক দোকানি বলেন, মার্কেটে আসার আগে বাইরের দোকানে পণ্য পাওয়া গেলে ক্রেতারা আর মার্কেটে এসে কী করবেন। বাইরে কিছু পাওয়া না গেলেই কেবল মার্কেটে আসেন ক্রেতারা।
রাস্তায় বসা বাজারে চলাচলেও ভোগান্তি
বনগ্রাম ও নবাবপুর রোডে ব্যক্তিগত গাড়ি, ভ্যান, পণ্যবাহী পিকআপ ও রিকশা চলাচল করে। পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাত নেই। ফলে রাস্তাতেই বাজার, যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে একটু পরপরই যানবাহনের জট লাগতেও দেখা যায়। নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে পথচারী ফরহাদ হোসেন বলেন, এই এলাকায় না থাকলেও কাজের কারণে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করতে হয়। রাস্তার ওপর বাজার বসার কারণে রিকশাভ্যানের জট ঠেলে যাতায়াত করতে হয় মাঝেমধ্যে। বনগ্রাম রোডের বাসিন্দা শরিফা খাতুন বলেন, রাস্তায় বাজার বসায় উপকার হয় সত্য। কিন্তু বাজারের ময়লা রাস্তাতেই থেকে যায়। পরিষ্কার করা হয় না। বৃষ্টি হলে রাস্তায় কাদা হয়ে যায়।
যোগাযোগ করা হলে ডিএসসিসির অঞ্চল-৪-এর নির্বাহী কর্মকর্তা হায়াত উদ দৌলা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ বাজার বসার খবর পেয়েছি। কয়েক দিনের মধ্যে উচ্ছেদ চালিয়ে জায়গাটি যেভাবে থাকার কথা সেভাবে রাখা হবে।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অঞ্চল-৪-এর আরেক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘উচ্ছেদ চালিয়েও লাভ হয় না। উচ্ছেদ করলে পুলিশ যদি আবার বসতে দেয়, তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।’