
লন্ডন চিড়িয়াখানা সফরটা যে রোদেলা হবে না, সেটা ধরেই নিয়েছিলাম। কিন্তু সকালে ঘুম ভেঙেই ধারণা পাল্টে গেল। পরিষ্কার আকাশ, মিষ্টি রোদ, খুব বেশি শীত নেই। বেশ মিষ্টি আবহাওয়া। গত মার্চের ঘটনা এটি। দ্রুত তৈরি হয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু চিড়িয়াখানার তথ্যকেন্দ্রে গিয়ে হতাশ হতে হলো। বার্ড ফ্লুর আশঙ্কায় বেশির ভাগ পাখিই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বড় খাঁচা বা এভিয়ারিতে কিছু পাখি দেখা যাচ্ছে।
এভিয়ারির কাছে সুন্দর সুন্দর নতুন পাখি দেখে মনটা ভরে গেল। হঠাৎই কেকা ধ্বনি কানে ভেসে এল। এভিয়ারির নেটের ফাঁকে ক্যামেরা রেখে ওর পেখম মেলার অপেক্ষায় থাকলাম। বৃষ্টি না থাকলেও পেখম-নৃত্যের কমতি হলো না। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। আনন্দের মধ্যেও মনটা বিষাদে ভরে উঠল এ কথা ভেবে যে, সুদর্শন এই পাখিটি একদিন এ দেশেও ছিল। আমাদের সীমাহীন লোভ ওদের বিলুপ্তির লাল বইয়ে নাম লেখাতে বাধ্য করেছে। আফসোস।
স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত একসময়ের আবাসিক এই পাখি কিন্তু আমাদের নীল ময়ূর নয়, যাদের আমরা এখনো চিড়িয়াখানায় দেখি। এরা হলো স্বল্প পরিচিত ওদেরই জাতভাই সবুজ ময়ূর। বর্মী ময়ূর নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Green peafowl, Burmese peafowl, Green-necked peafowl বা Java peafowl। Phasianidae পরিবারের এই ময়ূরের বৈজ্ঞানিক নাম Pavo muticus।
সবুজ ময়ূর নীল ময়ূর থেকেও সুন্দর। পুরুষ সবুজ ময়ূর লম্বায় ১৮০-৩০০ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে পেখমই ১৪০-১৬০ সেমি, যা নীল ময়ূরের থেকেও বড়। অন্যদিকে, ময়ূরীর দৈর্ঘ্য মাত্র ১০০-১১০ সেন্টিমিটার। ময়ূর-ময়ূরীনির্বিশেষে গড় ওজন ৪ দশমিক ৫ কেজি। নীল ময়ূরের তুলনায় এদের দেহগঠন কিছুটা খাড়া, গলা বেশি সবুজ, পেখম বেশি গাঢ় ও তাতে সোনালির প্রাধান্য। লেজের পেখম পালকের শেষ প্রান্তে প্রায় ২০০টি চোখ রয়েছে, যেগুলোর কেন্দ্রে অর্ধচন্দ্রাকৃতির নীলকে ঘিরে চক্রাকারে রয়েছে সবুজ, সোনালি ও বাদামি বলয়। ময়ূরের মাথার ঝুঁটি বেশ লম্বা ও খাড়া। ঝুঁটির পালক নীলচে, মাথার চাঁদি নীলচে-সবুজ, মুখমণ্ডল নীলচে-সাদা, চোখের নিচে কালো টান, কান-ঢাকনি কমলা-সোনালি। উজ্জ্বল চকচকে সবুজ পালকে কালচে আঁশ। ডানা কালচে-বাদামি, তাতে সবুজের ছোঁয়া। ঠোঁট ও নখ কালচে-ধূসর। পেখমহীন ময়ূরীর পালক অনুজ্জ্বল, দেহের ওপরটা কালচে-বাদামি, লেজে হালকা হলদে ডোরা। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে পুরোপুরি ময়ূরীর মতো।
সবুজ ময়ূর দক্ষিণ এশিয়ার পাখি। বর্তমানে এরা ভালো অবস্থায় নেই মোটেও। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় বিলুপ্ত এবং অন্যান্য দেশে বিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত এ দেশের বনতল ও বনের প্রান্তের আবাদি জমির আশপাশে একটি ময়ূরের সঙ্গে ৩-৫টি ময়ূরীকে বিচরণ করতে দেখা যেত। এরা মাটি আঁচড়ে বা ঝরাপাতা উল্টে-পাল্টে বীজ, কেঁচো, পোকামাকড়, সাপ, গিরগিটি ইত্যাদি খায়। তবে শস্যদানা, ফুলের কলি, রসাল ফলেও অরুচি নেই।
এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এরা মাটিতে বাসা বানায় ও তাতে ৩ থেকে ৬টি বাদামি ডিম পাড়ে। ময়ূরী একাই তা দেয়। ডিম ফোটে ২৬-২৮ দিনে। বাচ্চাদের বয়স ১৫-১৬ দিন হলেই তারা লাফ দিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক শূন্য মিটার পর্যন্ত যেতে পারে। আর ২-৫ মাস বয়সে দেহের চকচকে পালকগুলো গজিয়ে যায় ও উড়তে শেখে। তবে এরপরও পরবর্তী প্রজনন মৌসুম পর্যন্ত মায়ের সঙ্গেই থাকে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৬ বছর।