
‘কেমন আছেন? প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।’
স্মিত হাসলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। আজ তাঁর ৮০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৫ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন।
তাঁর হাসি দেখে সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেললাম, ‘৮০ বছর বয়সেও মনের তারুণ্য কীভাবে ধরে রাখলেন?’
মুস্তাফা মনোয়ার উত্তর দিলেন, ‘একটা আনন্দ থেকে যদি কাজটা করা যায়, তাহলে সেটা সম্ভব। আর সব সময় কাজটা আরেকটু ভালো করা যায় কি না, সে তাগিদটা ভেতর থেকে থাকতে হয়।’
মনে পড়ে গেল, এই তো কিছুদিন আগে আমরা শিল্পকলা একাডেমীতে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তিনি নন্দনতত্ত্ব নিয়ে বলবেন। নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টা দেড়েক পর তিনি এলেন। ততক্ষণে আমরা ক্লান্ত। কিন্তু যখন বলতে শুরু করলেন, সব ক্লান্তি যেন নিমেষে উবে গেল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা আমরা শুনছিলাম। এমনভাবে বলে চললেন যে, নন্দনতত্ত্ব নিয়ে ধোঁয়াশাগুলো আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকল।
সত্যিই তো! ভেতর থেকে কাজ করার তাগিদ না থাকলে এক জীবনে এত কিছু কি করতে পারতেন?
জলরঙে ভালো ছবি আঁকতেন। আর্ট কলেজে পড়ার সময় কলকাতায় যখন ছিলেন, খুব নাম হয়েছিল। নির্মাতা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, তাঁর আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে। কথা প্রসঙ্গেই জানা হয়ে যায়, সামনের বছর জলরঙের একটা প্রদর্শনী করবেন। এ জন্য আঁকছেন তিনি।
একসময় কলকাতার বিভিন্ন নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে আলাদা করে গানও শিখতে শুরু করেছিলেন। সে সময় শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, সেখানে যোগ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেশাত্মবোধক গানও গেয়েছেন। গান ছেড়ে দিলেন কেন জানতে চাইলে বললেন, ‘অনেক চর্চা করতে হয়। তা ছাড়া বাঁধাধরা জিনিস ভালো লাগে না। গানে তাল আছে। বড় ওস্তােদরা টান দিয়ে তালে ফিরতে পারেন। আমি পারতাম না।’
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের কাছে জানতে চাই ছেলেবেলার কথা। তিনি বলে চলেন আর আমরা কল্পনায় সেই সময়টিতে পৌঁছে যাই, যে সময়টিতে জীবন ছিল অন্য রকম। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হলো, সেটাই একসময় আত্মপরিচয় সন্ধানে মগ্ন করল বাঙালিকে। সেই সময়টি মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনেও অমূল্য স্মৃতি হয়ে আছে।
স্কুলে থাকতে বাবা কবি গোলাম মোস্তফার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করতেন। ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তেন। তখন ভাষা আন্দোলনের জন্য কার্টুন এঁকে এক মাসের জন্য জেলে গিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তাঁর মনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি করে। বাড়ি থেকে স্কুলে প্রথম হওয়ার চাপ ছিল না। বাবা কেবল বলতেন পড়তে, জানতে।
আর্ট কলেজে পড়া শেষে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৬০ সালে ঢাকায় এসে চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের (পিটিভি) ঢাকা কেন্দ্র চালু হলো। চারুকলার চাকরি ছেড়ে মুস্তাফা মনোয়ার সেখানে যোগ দিলেন। পাকিস্তানে তখন বাংলা সংস্কৃতির যাবতীয় শ্রেষ্ঠ জিনিসকে ভিন্ন সংস্কৃতি বলে নাম দেওয়া হতো। টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার পেছনের কারণ ছিল এটাই। বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার সুযোগটা তিনি নিতে চেয়েছিলেন।
এরই মধ্যে সত্তরের নির্বাচন পেরিয়ে এল একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ। ২৩ মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। তখন টেলিভিশনে অনুষ্ঠান শেষের পর পতাকা ওড়ানো দেখানো হতো। পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেখানো হবে না—এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। এঁদের মধ্যে মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন অন্যতম। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কথা রাত ১০টায়। কিন্তু সেদিন অনুষ্ঠান শেষ করা হলো রাত ১২টা পার হওয়ার পর। ততক্ষণে ২৪ মার্চ হয়ে গেছে, পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হলো।
অ্যানিমেশনের কাজেও উৎসাহ ছিল। বাংলাদেশে পাপেট শো ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর একক অবদানই বেশি। হুগলি, বাঁকুড়া, কলকাতায় পাপেট দেখে এ ব্যাপারে আগ্রহ জন্মে। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’। পারুলকে দেখেই ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন। তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।
টেলিভিশনে করেছেন রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী ও শেক্সপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা মুখরা রমণী বশীকরণ-এর মতো নাটক। যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো অনুষ্ঠানেরও রূপকার তিনি।
এত বছর ধরে এত কিছুর সঙ্গে জড়িত থাকা মানুষটি বর্তমান সময়ের শিল্প নিয়ে বেশ আক্ষেপ করে বললেন, এখন সাধনা নেই। প্রযুক্তি যতই আসুক, সাধনার বিকল্প নেই। সাধনার জায়গা কোনো দিন ম্যাকানাইজড হবে না।
সোমবার বিকেল পাঁচটায় বিদায় নেওয়ার আগে ছাদে গিয়ে ছবি তোলা হলো, ক্যামেরা নিয়ে নানা কথা বললেন তিনি। বসার ঘরে একটু বসলেন, তারপর ঢুকে গেলেন দোতলার ওয়ার্কশপে। অনেক কাজ আছে তাঁর। শুরুতেই বলেছিলেন কাজের আনন্দের কথা। হ্যাঁ, সে আনন্দ আজও পাচ্ছেন তিনি। আর তাই, আশিতেও তারুণ্য তাঁকে ছেড়ে যায়নি।