চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন নিয়ে দলে মিশ্র প্রতিক্রয়া সৃষ্টি হয়েছে। এ কমিটি গঠনে দলের সিংহভাগ নেতা-কর্মীই হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
গত বৃহস্পতিবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত তিন সদস্যের জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে গোলাম জাকারিয়াকে আহ্বায়ক, ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামকে সদস্যসচিব ও আইনজীবী রফিকুল ইসলামকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে।
সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তসিকুল ইসলাম বলেন, বিএনপিকে যাঁরা অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসেন, এমন নেতা-কর্মী এ কমিটিকে গ্রহণ করবেন না। এ কমিটি জেলা বিএনপির কোনো কাজে আসবে না।
গোমস্তাপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বাইরুল ইসলাম বলেন, ‘নেতা-কর্মীদের মধ্যে গোলাম জাকারিয়াকে নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা আমাদের উপজেলাতে তেমন নেই। তবে রফিকুল ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাঁকে অনেকে চেনেও না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ কমিটি আন্দোলন–সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য নয়। এ কমিটির সদস্যরা বিএনপির আন্দোলন ও সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
জেলার দুজন সাংসদের দাবি, তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে তাঁরা বিস্মিত।
আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, এ কমিটি গঠনে তারেক রহমানের সমর্থন রয়েছে।
আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে আন্দোলন তো ছিলই না। সারা দেশের আন্দোলন পরিস্থিতি যেমন চলবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে।
সদ্য গঠিত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাংসদ হারুনুর রশীদ বলেন, দলের মধ্য থেকে যাঁরা দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়ায় যুক্ত, তাঁদের মদদেই এই আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে জেলা বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনও।
হারুনুর রশীদ আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই জেলা বিএনপির কোনো প্রাথমিক সদস্যপদ নেই গোলাম জাকারিয়ার। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর বিপক্ষে গিয়ে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে ভোট করেন তিনি। দলে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। সেই গোলাম জাকারিয়াকে আহ্বায়ক করা হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম সম্পর্কে হারুনুর রশীদ বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনের আগের দিন রাতে রফিকুল ইসলাম দলবল নিয়ে আমার ও আমার সহকর্মীদের ওপর হামলা চালান। তাঁর (রফিকুল ইসলাম) বিরুদ্ধে হত্যা প্রচেষ্টার মামলা করি। মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হন। এ ছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল ওদুদের মঞ্চে উঠে রফিকুল নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। এমন লোক কীভাবে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হয়ে গেলেন, ভেবে পাচ্ছি না। আমি বিস্মিত হয়েছি।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম কমিটি হচ্ছে সদ্য গঠিত এ আহ্বায়ক কমিটি, এমন মন্তব্য করেন সংরক্ষিত আসনের সাবেক মহিলা সাংসদ ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া। কারও নাম না উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের রাজনীতি করার সময় যাঁরা দলে হারুন-পাপিয়াবিরোধী ভূমিকা রাখতেন, তাঁরাও দলে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। তাঁরাই এখন এ আহ্বায়ক কমিটি গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। দলের সিংহভাগ নেতা-কর্মীই এ কমিটি নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ।
জেলা বিএনপির সদ্য সাবেক সম্পাদক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট) আসনের সাংসদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সদ্য গঠিত জেলা আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের কোনো সদস্যপদ ছিল না। যাঁদের নিয়ে কমিটি করা হলো, (আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবকে ইঙ্গিত করে) তাঁদের কেউ জামায়াত, কেউ আওয়ামী লীগের মঞ্চে উঠেছেন। তারপরও হাইকমান্ড যেটা ভালো বুঝেছে, সেটা করেছে। এর বিরুদ্ধে মন্তব্য করতে চাই না।’
তবে এ কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে জেলা বিএনপিতে যাঁরা পুরোনো, চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাঁরা বিএনপিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। হারুন (হারুনুর রশীদ)-পাপিয়া (হারুনুর রশীদের স্ত্রী সৈয়দা আশিফা আশরাফি) বলয়ের বাইরে গিয়ে নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হবে জেলা বিএনপিতে। এমন মন্তব্য করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি হারুনুর রশীদের ওপর হামলার ঘটনাও অস্বীকার করেন। এ ছাড়া মঞ্চে উঠে নৌকায় ভোট চাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বাধ্য হয়ে ওই দিন মঞ্চে উঠেছিলাম। কিন্তু আওয়ামী লীগে যোগ দিইনি।’
গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘আমি ১৯৯৩ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হয়েছি। এর আগে সাত বছর ধরে জেলা যুবদলের সভাপতি ছিলাম। ১৯৯৬ ও ২০১১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের পক্ষেই কাজ করেছি। ১৯৯৬ সালে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর হারুনুর রশীদ ও সৈয়দা আশিফা আশরাফি পুরোনোদের বাদ দিয়ে রাজনীতি শুরু করে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায়। জেলার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানুল ইসলাম (প্রয়াত) ও আমাকে প্রথমিক কোনো সদস্যপদও দেয়নি। আমরা চার–দলীয় জোটের ব্যানারে কাজ করেছি। জোটভুক্ত জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছি। কেননা হারুন আমাদের ডাকেনি। যা হয়েছে (আহবায়ক কমিটি), তা তারেক রহমানের ইচ্ছায়। আমাকে ডেকে পদ দেওয়া হয়েছে।’