উন্নয়ন সহযোগীদের ভুল বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক বেয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ায় তা অনেকেরই সহ্য হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘দেশ-বিদেশে বসে বাংলাদেশবিরোধী শক্তি, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তাই নানা ষড়যন্ত্র করছে এই অগ্রযাত্রাকে রুখে দেওয়ার জন্য। মিথ্যা-বানোয়াট-কাল্পনিক তথ্য দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। বিদেশে আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের ভুল বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টেলিভিশন ও রেডিওতে তাঁর ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
কেউ যাতে মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। চলতি বছরে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল চালু হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেছেন, ২০২২ সাল হবে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো উন্নয়নের মাইলফলকের বছর।
সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, আগামী জুনে বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। অনেক ষড়যন্ত্রের জাল আর প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে যাচ্ছে সরকার। এই সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে সরাসরি রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করবে। এই সেতু দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে অবদান রাখবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, এ বছরের শেষ নাগাদ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার অংশে মেট্রোরেল চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ অংশে ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, মেট্রোরেল রাজধানী ঢাকার পরিবহন খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। আগামী অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে চালু হবে দেশের প্রথম টানেল।
তিনি বলেন, অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজও পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে। ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিট আগামী বছরের এপ্রিল নাগাদ চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার কী কী করেছে, তা জনগণই মূল্যায়ন করবেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, আমরা যেসব ওয়াদা দিয়েছিলাম, আমরা তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পেরেছি।’
সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দুর্নীতিবাজ যে দলেরই হোক আর যত শক্তিশালীই হোক, তাদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং হবে না। এ ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। তবে এই ব্যাধি দূর করতে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকার কঠোর হস্তে জঙ্গিবাদের উত্থানকে প্রতিহত করেছে। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রেখে বসবাস করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
ভাষণের শুরুতে দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আরও স্মরণ করেন জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। শ্রদ্ধা জানান ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ নির্যাতিত মা-বোনের প্রতি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানান সশ্রদ্ধ সালাম। গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের।
গত ১৩ বছরে তাঁর সরকারের অধীনে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন, মাতৃমৃত্যু-শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার হার বৃদ্ধিসহ নানা আর্থসামাজিক সূচকে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পর পর তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দিয়ে মানুষ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে একটি কল্যাণকামী, উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। যাতে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলোর কাতারে শামিল হতে পারে। তিনি বলেন, ‘এ জন্য অতীতে যেমন আপনারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, ভবিষ্যতে আমাদের সঙ্গে থাকবেন, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’
বিভিন্ন নীতিসহায়তা ও উদারনৈতিক আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের অভিঘাত মোকাবিলা করে গত অর্থবছরে দেশের জিডিপি ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৫৪ মার্কিন ডলারে।
করোনাভাইরাসের মহামারির কারণে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে ২০২০ এবং ২০২১ সাল অতিক্রম করতে হয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেন, সেই সংকট এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশবাসীকে এখনই সাবধান হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যাঁরা টিকা নেননি, তাঁদের দ্রুত টিকা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
সরকারের হাতে সাড়ে নয় কোটির বেশি ডোজ টিকা মজুত আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলতি মাস থেকে গণটিকা প্রদানের মাধ্যমে প্রতি মাসে এক কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১২ কোটি ৯৫ লাখ ৮০ হাজার ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছেন প্রায় ৭ কোটি ৫৮ লাখ মানুষ আর দুই ডোজ পেয়েছেন ৫ কোটি ৩৫ লাখ ৮২ হাজার। গত মাস থেকে বুস্টার ডোজ দেওয়া শুরু হয়েছে।