একজনের ফাঁসি, খালাস চার

শাজনীন তাসনিম রহমান
শাজনীন তাসনিম রহমান
শাজনীন হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের রায়
২৩ এপ্রিল, ১৯৯৮ গুলশানে নিজ বাড়িতে খুন হন শাজনীন তাসনিম রহমান
২ সেপ্টেম্বর, ২০০৩ বিচারিক আদালতে ছয় আসামির ফাঁসির আদেশ
১০ জুলাই, ২০০৬ হাইকোর্টে পাঁচ আসামির ফাঁসি বহাল, একজন খালাস

দেড় যুগ আগে গুলশানের নিজ বাড়িতে শাজনীন তাসনিম রহমানকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া পাঁচ আসামির মধ্যে একজনের সাজা বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বাকি চারজন ফাঁসির আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও জেল আপিল নিষ্পত্তি করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে শাজনীনের বাড়ির গৃহভৃত্য শহীদুল ইসলামের (শহীদ) ফাঁসি বহাল রাখা হয়। অপর চার আসামি শাজনীনের বাড়ির সংস্কারকাজের দায়িত্ব পালনকারী ঠিকাদার সৈয়দ সাজ্জাদ মইনুদ্দিন হাসান ও তাঁর সহকারী বাদল, বাড়ির গৃহপরিচারিকা দুই বোন এস্তেমা খাতুন (মিনু) ও পারভীনকে খালাস দেন আদালত।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় শাজনীনের বাবা ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন বাবা হিসেবে আমাকে গহিন দুঃখ ও হৃদয়বিদারক স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে, যাঁর মেয়েকে সবচেয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং তারপর তাঁকে অন্তহীনভাবে, ধৈর্যসহকারে ও আশা নিয়ে ১৮টি যন্ত্রণাদায়ক বছর ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। মাননীয় আদালতের রায়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি, এই রায়ে একজন বাবা হিসেবে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও হতাশ। পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর আমরা তা পর্যালোচনা করব এবং আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করব।’
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাদীপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর সেটা দেখে বিবেচনা করা হবে যে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত কি না।
১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানে নিজ বাড়িতে খুন হন শাজনীন তাসনিম রহমান। ওই ঘটনায় করা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার হয় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। ২০০৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিচারিক আদালত শাজনীনকে ধর্ষণ ও খুনের পরিকল্পনা এবং সহযোগিতার দায়ে ছয় আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেন। তাঁরা হলেন হাসান, বাদল, শহীদ, মিনু, পারভীন ও শনিরাম মণ্ডল।
বিচারিক আদালতের রায়ের পর এই মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য হাইকোর্টে যায়। একই সঙ্গে আসামিরাও আপিল করেন। ২০০৬ সালের ১০ জুলাই হাইকোর্ট শনিরামকে খালাস দেন। বাকি পাঁচ আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়।
এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন চার আসামি হাসান, বাদল, মিনু ও পারভীন। ফাঁসির আদেশ পাওয়া আরেক আসামি শহীদ জেল আপিল করেন। গতকাল আপিল বিভাগ চার আসামির আপিল মঞ্জুর ও শহীদের জেল আপিল খারিজ করেন।
রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে আসামিপক্ষের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, শহীদ স্বীকারোক্তি করেছিলেন যে তিনিই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাঁকে ছাড়া বাকি সবাইকে খালাস দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছিল। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাটির রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। জজ আদালতে থাকা অন্য মামলাটি বাতিল করে দিয়েছেন আদালত।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে শাজনীন হত্যাকাণ্ডের পরদিন তাঁর বাবা লতিফুর রহমান গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় একটি হত্যা মামলা করেন। একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর ওই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করে সিআইডি। তদন্ত শেষে প্রথম মামলায় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-১ এবং দ্বিতীয় মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। দুটি মামলাতেই আদালত অভিযোগ গঠন করেন।
পরে দুটি মামলারই অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামিরা। ১৯৯৯ সালের ৬ জুলাই বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল করিম ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের (পরে প্রধান বিচারপতি) সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায়ে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজের আদালতে বিচারাধীন হত্যা মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। কারণ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ইতিমধ্যে আসামিদের খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বিচারাধীন ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটির কার্যক্রম চলবে। ওই রায়ে হাইকোর্ট আরও বলেন, ধর্ষণ ও হত্যা দুটি পৃথক অপরাধ, একটি আরেকটি থেকে আলাদা। উল্লেখ্য, শাজনীনের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, তাঁকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। আরও উল্লেখ্য যে, ওই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শাজনীনের শরীরে সুস্পষ্টভাবে ২৫টি আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা একই অস্ত্রের দ্বারা সংঘটিত নয় এবং জব্দ তালিকা অনুযায়ীও দুটি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছিল।
এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল বিভাগে যান। ১৯৯৯ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বিচারপতি লতিফুর রহমান (পরে প্রধান বিচারপতি), বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমান ও বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর (পরে প্রধান বিচারপতি) সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চ আসামিদের আপিল আবেদন খারিজ করে দেন। সর্বোচ্চ আদালত রায়ে বলেন, হাইকোর্ট সঠিকভাবেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে চলা মামলাটির কার্যক্রম চালানোর নির্দেশ দিয়ে অন্য মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলেছেন। এটি এমন একটি মামলা, যেখানে ধর্ষণের সময় হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। বরং স্পষ্টত এখানে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ধর্ষণ ও হত্যা দুটি আলাদা অপরাধ এবং এ ক্ষেত্রে একই অপরাধে দুবার বিচার হওয়ার ঘটনা ঘটবে না।
সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার চলতে থাকে। ঘটনার প্রায় পাঁচ বছর পর বিচারিক আদালতের রায়ে ছয় আসামিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। এরপর হাইকোর্টে একজন বাদে বাকি পাঁচ আসামির ফাঁসি বহাল থাকে।
শাজনীন হত্যাকাণ্ডের ১৮ বছর পর গত ২৯ মার্চ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের তিন সদস্যের বেঞ্চে ওই পাঁচ আসামির আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল। তিন সদস্যের ওই বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। তবে গত ৫ এপ্রিল বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীকে যুক্ত করে পাঁচ সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে শুনানি নেওয়া হয়। ১১ মে ওই বৃহত্তর বেঞ্চে আসামিদের আপিল শুনানি শেষে রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
আপিল বিভাগে বাদীপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী নজরুল ইসলাম চৌধুরী, এ এম আমিনউদ্দিন, এ এস এম আবদুল মবিন ও সরোয়ার আহমেদ। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং এস এম শাহজাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোন্দকার দিলীরুজ্জামান।