
ঠাকুরগাঁওয়ে কতটি ইটভাটা রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী ৬৭টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি ১২০ ফুট উঁচু স্থায়ী চিমনির ভাটা ও ১৫টি পরিবেশসম্মত জিগজ্যাগ ভাটা। স্থায়ী চিমনির ৫২টি এবং প্রযুক্তি পরিবর্তন করে ২টি জিগজ্যাগ ভাটায় দেদারসে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।
চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ের ওই ৫৪টি ইটভাটায় প্রায় ৩২ লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হবে। ভাটার মালিকদের একটি সূত্র জানায়, নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে মে মাস পর্যন্ত চলে ইট পোড়ানোর মৌসুম। এ সময়ে সাধারণত ভাটাগুলোতে অন্তত ৭ দফা ইট পোড়ানো যায়।
কয়েকটি ইটভাটার কয়েকজন শ্রমিক বলেন, নিয়মানুযায়ী কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর কথা থাকলেও মূলত কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। একটি বড় ইটভাটায় প্রতি দফায় ৫ লাখ ইট পোড়াতে ২৩ থেকে ২৪ দিন লাগে। এ সময়টাতে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ মণ কাঠের প্রয়োজন হয়। গড়ে ৩৫০ মণ হিসাবে প্রতিটি ভাটায় ১ দফায় প্রয়োজন হয় ৮ হাজার ৪০০ মণ কাঠ। সে হিসাবে ৫৪টি ভাটায় প্রতি দফার ইট পোড়াতে কাঠ পুড়বে ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ মণ। মৌসুমে ৭ দফা ইট পোড়াতে হলে প্রতিটি ভাটায় কাঠ লাগবে ৫৮ হাজার ৮০০ মণ। সে হিসেবে ৫৪টি ভাটায় পুড়বে ৩১ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ মণ কাঠ।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩-এ ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বলা আছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি হিসাবে কোন কাঠ ব্যবহার করিতে পারিবেন না। যদি কোন ব্যক্তি এই ধারা লঙ্ঘন করিয়া ইটভাটায় ইট পোড়ানোর কাজে জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’
সদর উপজেলার ইয়াকুবপুরের আরইউএস, এসকে, কেএমবি, এসবিএইচ, এমএবি ও সাধনা; বালিয়াডাঙ্গীর কেয়া ব্রিকস, জনতা ও এমবিবি; রানীশংকৈলের এসএসই ব্রিকসসহ বিভিন্ন ইটভাটা ঘুরে সেখানে কাঠের স্তূপ দেখা গেছে। ওই স্তূপ থেকে কাঠ নিয়ে ভাটার চুল্লিতে ফেলছেন শ্রমিকেরা। ফাড়াবাড়ি সড়কে ঠিকাদার রামবাবুর এসকে ব্রিকস ও কোয়াটল গ্রামে কামাল হোসেনের সাধনা নামের ইটভাটায় দেখা যায়, সেখানে জিগজ্যাগ ভাটার প্রযুক্তি পরিবর্তন করে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
কেএমবি ইটভাটার মালিক মোশারুল হক বলেন, কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে কাঠ পাওয়া যায়। কয়লা কিনতে হলে নগদ টাকার প্রয়োজন হয়। এ কারণে অনেক ভাটার মালিক কাঠ পোড়াতে আগ্রহী।
সাধনা ব্রিকসের মালিক কামাল হোসেন বলেন, ভাটায় কীভাবে কাঠ পুড়ছে, তা ডিসি ভালো করেই জানেন। ডিসি কীভাবে জানেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি জেলার দায়িত্বে আছেন। সেই দায়িত্ব থেকেই তাঁকে জানতে হয়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, জেলা প্রশাসক মো. আবদুল আওয়াল বলেন, আইন মেনেই ভাটাগুলোতে ইট পোড়াতে হবে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আকতারুজ্জামান বলেন, ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ। কেউ নিয়ম অমান্য করে কাঠ পোড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বন ও পরিবেশ অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মো. হাফিজ আল আমিন বলেন, ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৃক্ষ জানমালের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। ব্যাপক হারে বৃক্ষনিধনের ফলে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়বে। উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশও হুমকিতে পড়বে।