সারা বিশ্বের শান্তি ও মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে রাঙামাটির রাজবন বিহারে দুদিনব্যাপী কঠিন চীবরদান উৎসব শেষ হয়েছে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব এটি। গতকাল শুক্রবার দিনভর নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উৎসব উদ্যাপন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো নারী-পুরুষ এ উৎসবে অংশ নেন।
কঠিন চীবরদান উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সম্প্রতি নেপালে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী দেখার সুযোগ হয় তাঁর। সেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি দেশের বৌদ্ধমন্দির রয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো মন্দির নেই। পরে বিষয়টি নেপাল সরকারের নজরে আনা হয়। সেখানে বাংলাদেশের জন্য এক একর জায়গা পাওয়া গেছে। সে জায়গায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি বৌদ্ধমন্দির স্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন বলে জানান তিনি।
সমাপনী অনুষ্ঠানে চাকমা সার্কেল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, বৌদ্ধধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী কঠিন চীবরদান হলো দানের সর্বশ্রেষ্ঠ।
রাজবন বিহারের উপাসক উপাসিকা পরিষদের সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, আড়াই হাজার বছর আগে কঠিন চীবরদান করা শুরু হয়। কিন্তু কয়েক শ বছর আগে হারিয়ে যায়। ৪৩ বছর আগে রাজবন বিহারের অধ্যক্ষ বনভান্তে নামে খ্যাত সাধনানন্দ মহাস্থবিরের প্রেরণায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আবার কঠিন চীবরদান উৎসব শুরু হয়। বৌদ্ধ যুগের আদলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চরকায় তুলা থেকে সুতা বের করে তাঁতে বুনে কাপড় তৈরি করা হয়। তিনি বলেন, কঠিন চীবরদান কেবল বাংলাদেশেই হচ্ছে তা নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অনুষ্ঠানে কঠিন চীবরদান উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো বাণী পাঠ করেন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বুষকেতু চাকমা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও কঠিন চীবরদান উপলক্ষে বাণী পাঠান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপেন দেওয়ান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জীন বোধি মহাথের। উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি সদর সেনা জোনের ভারপ্রাপ্ত জোন অধিনায়ক মেজর মো. নাঈমূল ইসলাম খান ও সহকারী পুলিশ সুপার মো. আসলাম।
এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি চীবর (বৌদ্ধসাধকদের পরার কাপড়) ভিক্ষুদের দান করেন। অনুষ্ঠানে চীবরদানের পাশাপাশি ধর্মীয় রীতিতে পঞ্চশীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কারদান, হাজার বাতিদানসহ নানা দানের কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরে রাজবন বিহারের আবাসিক প্রধান প্রজ্ঞালংকার মহাস্থরিব পুণ্যার্থী নারী-পুরুষের উদ্দেশে ধর্মীয়দেশনা (উপদেশ বাণী) দেন।
দীঘিনালা: পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু প্রয়াত সাধনানন্দ মহাস্থবিরের (বনভান্তে) প্রথম সাধনাস্থল খাগড়াছড়ির দীঘিনালা বনবিহারে গতকাল কঠিন চীবরদান অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হাজারো নারী-পুরুষ অংশ নেন। দুদিনের এ উৎসব বৃহস্পতিবার শুরু হয়।
গতকাল আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য শতরুপা চাকমা, ইউপি চেয়ারম্যান চয়ন বিকাশ চাকমা। প্রধান ধর্মদেশক হিসেবে আলোচনা করেন বনভান্তের অন্যতম শিষ্য নন্দপাল মহাস্থবির।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি}