করোনার হাসপাতাল বাড়ছে

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

কোভিড-১৯ রোগী চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল ও শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। কনভেনশন সেন্টার, সিটি করপোরেশনের মার্কেট ও পড়ে থাকা ভবনও ব্যবহার করতে চায় সরকার। সর্বোচ্চ ৩০ হাজার রোগীকে পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

রোগী বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দ্রুত বেশ কিছু হাসপাতালকে শুধু কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্ধারণ করার কাজে নেমেছেন। অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) আমিনুল হাসান গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আরও কিছু হাসপাতালকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট করতে।’

দেশে ৮ মার্চ প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের ঘোষণা দেওয়া হয়। গতকাল পর্যন্ত শনাক্ত রোগী বেড়ে হয়েছেন ৪৮২ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৩০ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩৬ জন।

বর্তমানে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে রাজধানীর সরকারি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল ও ঢাকা মহানগর হাসপাতালে। এর বাইরে ঢাকায় রেলওয়ে হাসপাতাল, মিরপুর মাতৃ ও শিশু হাসপাতাল, শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল এবং রিজেন্ট হাসপাতাল (উত্তরা ও মিরপুর শাখা) ও সাজিদা ফাউন্ডেশন হাসপাতাল প্রস্তুত রয়েছে। সরকারনির্ধারিত এই নয়টি হাসপাতালের মধ্যে কুর্মিটোলা ও কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী আগে থেকে প্রস্তুত ছিল। বাকি সাতটি হাসপাতাল কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করতে এক মাসের বেশি সময় লেগেছে। এই নয়টি হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ১ হাজার ৩৩০।

সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রগুলো বলছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সর্বোচ্চ ৩০ হাজার রোগীকে পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। সেটা মাথায় রেখেই হাসপাতাল ও শয্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

সরেজমিন পরিস্থিতি

রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার কাজে ব্যবহার নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, বার্ন ইনস্টিটিউটকে এই কাজে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

>

সর্বোচ্চ ৩০ হাজার রোগীকে পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

গত শুক্রবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি চিঠি গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। এতে বার্ন ইউনিটকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করার জন্য বলা হয়েছে।

গতকাল দুপুর ১২টায় বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, সমন্বয়কারী অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে করণীয় ঠিক করতে সভা করছেন। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের রোগীদের নতুন ভবনে সরিয়ে আনা হবে।

তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার আয়োজনের ব্যাপারে অনেকেরই আপত্তি আছে। একাধিক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক বলেছেন, রোগী ছাড়াও হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসে। আলাদা ইউনিট বা ওয়ার্ড থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে।

গতকাল সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বার্ন ইউনিটকে করোনা ইউনিট করার সিদ্ধান্ত আবার পরিবর্তন হতে পারে।

বেলা দেড়টায় মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটটিকে চিকিৎসার কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কাজে ব্যস্ত স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মীরা। স্বাস্থ্য প্রকৌশল পরিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই মার্কেটকে দেড় হাজার শয্যার আইসোলেশন হাসপাতাল বানানোর কাজ চলছে। দিন-রাত কাজ হচ্ছে। আশা করা যায়, ১৫ দিনে হাসপাতালটি তৈরি হয়ে যাবে।’

আরও প্রস্তুতি

গতকাল নিয়মিত কোভিড-১৯ বিষয়ক বুলেটিন প্রচার অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের একটি সম্মেলন কেন্দ্রকে অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

গতকাল এই কেন্দ্রে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আমিনুল হাসান। তিনি বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে কোভিড-১৯ চিকিৎসার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। রাজধানীর দিয়াবাড়িতে চারটি ভবন প্রস্তুত করা হচ্ছে চিকিৎসকদের জন্য। কোভিড-১৯ সেবায় সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের অন্যদের থেকে পৃথক রাখার জন্য এই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা শহরের আরও দুটি হাসপাতালকে এই কাজে ব্যবহারের চিন্তা চলছে। ব্যবহার করা হবে এমন হাসপাতালের তালিকায় আছে মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল এবং জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

ঢাকার বাইরে

১০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে শনাক্ত হওয়া রোগীর মধ্যে ঢাকা শহরে ২৩৭ জন। ঢাকার বাইরে ১৪৭ জন। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দেশের অন্যান্য জেলার শনাক্ত রোগীদের এখন ঢাকায় এনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে এটা আর করা সম্ভব হবে না। তাই ঢাকার বাইরেও কোভিড-১৯ রোগী চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা) ইকবাল কবির প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি জেলার ১০ জন করে নতুন চিকিৎসককে কোভিড-১৯ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এঁদের কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তবে বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া আছে।

অন্যদিকে হাসপাতাল শাখার পরিচালক আমিনুল হাসান বলেছেন, ৬০টি জেলায় কোভিড-১৯ চিকিৎসায় হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি প্রয়োজন পড়ে, তাহলে জেলা পর্যায়ের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে এর আওতায় আনা হবে।’ ঢাকার বাইরে ৬ হাজার ৬০০ শয্যার প্রস্তুতি আছে বলে তিনি জানান।

অন্য প্রস্তুতি

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় সরকার একটি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজে ব্র্যাকের কর্মীদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সরকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মীদেরও কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসায় ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিককে এই কাজে ব্যবহার করা হবে। কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডাদের (সিএইচসিপি) ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সন্দেহভাজনদের নমুনা সংগ্রহের কাজে এঁদের লাগানো হবে।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক শাহ মুনির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই ব্যবস্থা নিচ্ছেন। হাসপাতালের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিমাণে শয্যা বাড়ানো হচ্ছে তা মোটামুটি ঠিকই আছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে হয়তো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে।