কালিদাসের সুস্বাদু সন্দেশ

বড় পাত্রে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কালিদাসের সন্দেশছবি: প্রথম আলো

জরাজীর্ণ চৌচালা টিনের ঘরে পুরোনো একটি দোকান। বাড়তি কোনো চাকচিক্য নেই। সাদামাটা কাচঘেরা তাকে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সন্দেশ। তবে বেচাকেনা চলছে দেদার। এটি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের কালিদাস মিষ্টান্ন ভান্ডার। উপজেলার জামুর্কী বাজারের এ দোকানের সন্দেশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে।

১৯৪০ সালে জামুর্কী গ্রামের বাসিন্দা কালিদাস চন্দ্র সাহা নিজেই সন্দেশ তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। আস্তে আস্তে আশপাশের গ্রামে সেই সন্দেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কালিদাস চন্দ্র সাহার উত্তরসূরিরা এখনো সেই সুনাম ধরে রেখেছেন।

সম্প্রতি কালিদাস মিষ্টান্ন ভান্ডারে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের কর্মচারীরা সন্দেশ বানানোয় ব্যস্ত। সন্দেশ তৈরির জন্য প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে এলাচ, চিনি অথবা গুড় দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করছেন তাঁরা। আর দোকানের সামনে ক্রেতাদের চিরচেনা ভিড়।

নড়াইল থেকে টাঙ্গাইল সদরে বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছেন হাবিবুল্লাহ। টাঙ্গাইল আসার পর এখানে সন্দেশ খেতে তিনি এ দোকানে আসেন। হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘এত ভালো সন্দেশ এর আগে কখনো খাইনি। দারুণ স্বাদ। সন্দেশের মানও বেশ ভালো।’

পাশের পাকুল্যা গ্রামের বাসিন্দা ইমরান চৌধুরী বলেন, জেলার বাইরের মানুষের কাছেও কালিদাসের সন্দেশ পরিচিত। সবাই এই সন্দেশের স্বাদের ভক্ত। এই সন্দেশের কথা মনে হলেই জিবে পানি আসে।

দোকানের কর্মচারী প্রকাশ চন্দ্র ও গোবিন্দ চন্দ্র জানান, প্রায় প্রতি ঘণ্টায় চুলা থেকে একটি করে বড় কড়াই নামানো হয়। একটি কড়াই থেকে প্রায় ৩০ কেজি সন্দেশ বানানো যায়। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে বিক্রি আগের চেয়ে কিছুটা কমে গেছে।

১৯৮২ সালে এ দোকানের প্রতিষ্ঠাতা কালিদাস চন্দ্র সাহা মারা যান। এরপর তাঁর বড় ছেলে সমর চন্দ্র সাহা ব্যবসার হাল ধরেছেন।

সমর চন্দ্র জানান, দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁর বাবা কালিদাস চন্দ্র বিয়ে করেন। এরপর তাঁকে সংসার থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়। ওই সময় কালিদাস সারা দিন স্থানীয় একটি মিষ্টির দোকানে বসে থাকতেন। সেখানে বসে থাকতে থাকতেই তিনি সন্দেশ তৈরির পদ্ধতি শিখে ফেলেন।

এরপর কালিদাস চন্দ্র সাহা নিজেই সন্দেশ তৈরি করে বিক্রি শুরু করেন। শুরুতে একা দোকান চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন কালিদাস। এরপর কালিদাস তাঁর ভাই গৌর চন্দ্র সাহাকে সঙ্গে নিয়ে দোকান চালাতে থাকেন। কয়েক বছরের মধ্যেই কালিদাস আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠেন। তাঁর বাবাও তখন কালিদাসকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।

কালিদাসের মৃত্যুর পর ছাত্রাবস্থা থেকে সমর চন্দ্র সাহা দোকানে বসতে শুরু করেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। চিনি ও গুড়ের তৈরি দুই ধরনের সন্দেশ পাওয়া যায়। দুই ধরনের সন্দেশ বর্তমানে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।

সমর চন্দ্র সাহা বলেন, ‘অনেক বিখ্যাত মানুষ আমাদের সন্দেশ খেয়ে প্রশংসা করেছেন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জামুর্কী বাসস্ট্যান্ডে এক অনুষ্ঠানে এসে আমাদের দোকানের সন্দেশ খান। ওই সময় তাঁর বাবা চিনি ও গুড় দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি পাঁচ কেজি ওজনের দুটি সন্দেশ বঙ্গবন্ধুকে উপহার দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মার্চ ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে এই সন্দেশ দিয়ে আপ্যায়ন করে।’

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে লোকজন গাড়ি থামিয়ে এ দোকান থেকে সন্দেশ কিনে নিয়ে যান। সমর চন্দ্র সাহার মতে, তাঁদের সততা আর সন্দেশের গুণগত মানের কারণেই মানুষ এত দিন ধরে তাঁদের দোকানের ওপর আস্থা রেখেছেন। করোনার পর থেকে বেচাকেনায় কিছুটা ছন্দপতন হলেও শিগগিরই আবার ঘুরে দাঁড়াবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।