কুয়েট অধ্যাপকের মৃত্যু: সুষ্ঠু তদন্তের দাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক মো. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পূর্বাপর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকেরা অবস্থান নিয়ে শিক্ষক সেলিমের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাবেন আগামীকাল বুধবার দুপুর ১২টায়। এ কর্মসূচি ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ‘শিক্ষকদের নীরবতা আর নির্লিপ্ততাই ছাত্রসংগঠনগুলোর হাতকে শক্তিশালী করেছে। সেলিম হোসেনের অকালমৃত্যুর পরোক্ষ কারণ হয়তো আসলে আমরা শিক্ষকেরাই।’
আজ মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন ৫১ জন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুয়েটের লালন শাহ হলের খাদ্য ব্যবস্থাপক (ডাইনিং ম্যানেজার) নির্বাচন নিয়ে কয়েক দিন ধরে ছাত্রলীগ নেতারা প্রভোস্ট সেলিম হোসেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। ১ ডিসেম্বরে দুপুরে ছাত্রলীগ নেতারা ওই শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং হুমকি দেন। মঙ্গলবার বিকেলে অধ্যাপক সেলিম হোসেনের মৃত্যুর পর অভিযোগ আসে, ওই দিন সকালে কুয়েট ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাঞ্ছনা ও অপদস্থের শিকার হওয়ার পর তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন।
সেলিম হোসেনকে শৈশবেই জীবনসংগ্রামে জড়িয়ে পড়তে হয়। কুয়েটেই পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর প্রবাসে উচ্চশিক্ষা শেষে আবার কুয়েটেই ফিরে আসেন। তিনি কুয়েটের একমাত্র ক্রিপ্টোগ্রাফিতে পিএইচডি করা অধ্যাপক। তাঁর ওপর ভিত্তি করে ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একটি নতুন ল্যাব তৈরির পরিকল্পনা ছিল। প্রবাসের মাটিতে উন্নত জীবন আর পেশাগত সাফল্যের হাতছানি উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত হয়তো তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সেটি করেছেন নিশ্চয়ই দেশের প্রতি ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ থেকে। এ রকম একজন নিবেদিত প্রাণ শিক্ষকের সান্নিধ্যে এসে বছরের পর বছর কত হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী নিজেদেরকে আরও শাণিত করতে পারত, মূল্যবান দক্ষতা আর জ্ঞান অর্জন করতে পারত কিন্তু তাঁর এই অকালপ্রস্থান কুয়েট তথা পুরো দেশের জন্যই একটা অপরিমেয় ক্ষতি হয়েই থাকবে।
বিবৃতিতে শিক্ষকেরা বলেছেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত অবাক হওয়ার মতো হলেও বছরের পর বছর প্রতিটি ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত হল প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করে। কোন ছাত্র হলে কোন রুমে থাকবে—এগুলো সবই ঠিক হয় ছাত্রসংগঠনের নেতা–নেত্রীদের মর্জিমাফিক। হলের একটা সিটের বিনিময়ে কিনে নেওয়া হয় শর্তহীন রাজনৈতিক আনুগত্য আর ক্যাডার নামক রাজনৈতিক গুন্ডা বানানোর লাইসেন্স। প্রক্রিয়াটি যুগের পর যুগ চলছে। কারণ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো পেশিশক্তির মাধ্যমে দখলে রাখতে চেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং শাসক দলের কাছে এটি মূল্যবান পেশিশক্তির আধার হিসেবে, রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল শক্তি হিসেবে। দুঃখের বিষয় আমরা শিক্ষকেরা বছরের পর বছর শাসক দলের এ নষ্ট পরিকল্পনার অংশ হয়েছি এর প্রতিবাদ না করে অথবা এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। হল প্রশাসনে থাকা শিক্ষকেরা এ ছাত্রসংগঠনগুলোর খবরদারি বিনা শর্তে মেনে নিয়েছেন ঝামেলা এড়ানোর জন্য। প্রকান্তরে আমাদের শিক্ষকদের যুগ যুগ ধরে এই নীরবতা আর নির্লিপ্ততাই এই ধরনের ছাত্রসংগঠনগুলোর হাত শক্তিশালী করেছে। সেলিম হোসেনের এই অকালমৃত্যুর পরোক্ষা কারণ হয়তো আসলে আমরা শিক্ষকেরাই। আমাদের তাই স্বীকার করতে হবে যে অনেক হয়েছে, আর নয়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোকে যেকোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। হল প্রশাসনের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আমরা চাই কুয়েট কর্তৃপক্ষ কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে এ অপমৃত্যুর একটি সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনবে।’
স্বাক্ষরকারী শিক্ষকেরা হলেন—আনু মুহাম্মদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতি অধ্যাপক; রুশাদ ফরিদী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতি বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; আরাফাত রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সহকারী অধ্যাপক; মার্জিয়া রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সহকারী অধ্যাপক; জি এইচ হাবীব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; সৌভিক রেজা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ, অধ্যাপক; অর্পিতা শামস মিজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/ব্রিস্টল ল’ স্কুল, আইন, সহকারী অধ্যাপক; তাসনীম সিরাজ মাহবুব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি, সহযোগী অধ্যাপক; কামাল চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, অধ্যাপক; সায়েমা খাতুন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, সহযোগী অধ্যাপক; মিম আরাফাত মানব, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, প্রভাষক; তাসমিয়াহ তাবাসসুম সাদিয়া, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রভাষক; দিপংকর কুমার, বশেমুরবিপ্রবি, গণিত, সহযোগী অধ্যাপক; মাহবুবুল হক ভূঁইয়া, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; কামরুল হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পদার্থবিজ্ঞান, অধ্যাপক; সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সহযোগী অধ্যাপক; কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; কাজলী সেহরীন ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সহকারী অধ্যাপক; মির্জা তাসলিমা সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, অধ্যাপক; সাঈদ ফেরদৌস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, অধ্যাপক; জাকিয়া সুলতানা মুক্তা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ, বাংলা বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; মো. সাদেকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, সহকারী অধ্যাপক; গৌতম রায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, সহকারী অধ্যাপক; নাসির আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি, অধ্যাপক; জাহাঙ্গীর আলম, পটুয়াখালী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নৃবিজ্ঞান, সহকারী অধ্যাপক; নায়িম সুলতানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন অধ্যয়ন, অধ্যাপক; মোহাম্মদ আলমগীর, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইংরেজি প্রভাষক; তাহমিনা খানম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবস্থাপনা, সহযোগী অধ্যাপক; বখতিয়ার আহমেদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, অধ্যাপক; মো. আসাদুজ্জামান, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সহকারী অধ্যাপক; আবুল ফজল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা, সহকারী অধ্যাপক; কাজী শুসমিন আফসানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাট্যকলা, সহযোগী অধ্যাপক; আরিফুজ্জামান রাজীব, বশেমুরবিপ্রবি, ইইই, সহকারী অধ্যাপক; খন্দকার আশরাফুল মুনিম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থনীতি, অধ্যাপক; মোর্ত্তূজা আহমেদ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায় প্রশাসন, সহযোগী অধ্যাপক; খোকন হোসেন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পদার্থবিজ্ঞান অধ্যাপক; সুস্মিতা চক্রবর্তী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ফোকলোর, অধ্যাপক; খাদিজা মিতু, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, সহযোগী অধ্যাপক; রায়হান রাইন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দর্শন অধ্যাপক; মাহমুদা আকন্দ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দর্শন, সহযোগী অধ্যাপক; মাহমুদুল সুমন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, অধ্যাপক; পারভীন জলী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস বিভাগ, সহযোগী অধ্যাপক; আইনুন নাহার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, অধ্যাপক; মো. নুরুজ্জামান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজি ডিসিপ্লিন, সহযোগী অধ্যাপক; কাজী রবিউল আলম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান, সহযোগী অধ্যাপক; সৈয়দ হাসান মাহমুদ, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইংরেজি, সহকারী অধ্যাপক; সুবর্ণা মজুমদার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সহযোগী অধ্যাপক; মাইদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, সহকারী অধ্যাপক; মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, সহযোগী অধ্যাপক; সায়মা আলম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, সহকারী অধ্যাপক; ফাহমিদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা; অধ্যাপক।