কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের অবস্থান দ্বান্দ্বিক

ড. তোফায়েল আহমেদ
ড. তোফায়েল আহমেদ

দেশের কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অবস্থান পদ্ধতিগত-ভাবে দ্বান্দ্বিক। কেন্দ্রে চলছে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারব্যবস্থা। আর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান চলছে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির আদলে। মেয়র বা চেয়ারম্যানকেন্দ্রিক এ পদ্ধতির কারণে স্থানীয় নির্বাচনে দিন দিন কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়ে চলেছে। রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে ভোটাররাও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ মন্তব্য স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদের। গতকাল বুধবার প্রথম আলো কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিমিয় করেন তিনি।তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে রাজনীতি থেকে বিযুক্ত করা যাবে না। রাজনীতির মধ্যে থেকেই এ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচনগুলো যেভাবে রাজনৈতিক চরিত্র পাচ্ছে, তাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনো লাভ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামো ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে এর ওপর কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজনীতির প্রভাব কমাতে হবে।ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়ে তোফায়েল আহমেদ বলেন, নতুন পদ্ধতি অনুযায়ী সব স্থানীয় সরকারব্যবস্থার জন্য একটি মূল আইন থাকবে। স্থানীয় সরকারের স্তরগুলো কমবেশি একই রকম হবে। ইউনিয়ন পরিষদেরভেতরে পৌরসভা বা উপজেলার ভেতরে পৌরসভা অথবা ইউনিয়ন পরিষদ থাকবে না। প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানই স্বতন্ত্র হবে। তবে একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক থাকবে। সরাসরি ভোটে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। পরে কাউন্সিলরদের ভোটে তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র বা চেয়ারম্যান এবং পরিষদের অধিবেশন পরিচালনার জন্য একজনকে স্পিকার নির্বাচিত করা হবে। কাউন্সিলররা প্রয়োজনে মেয়র বা চেয়ারম্যানের ওপর অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবেন। বর্তমানে সরকার নির্বাহী আদেশে যেভাবে চেয়ারম্যান বা মেয়রদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে থাকেন, তা আর সম্ভব হবে না।তোফায়েল আহমেদ বলেন, এতে স্থানীয় সরকারে এক ব্যক্তির কর্তৃত্ব কমে যাবে। কাউন্সিলর বা সদস্যরা সমান গুরুত্ব পাবেন। ফলে স্থানীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং সাংসদ ও আমলাদের হস্তক্ষেপ কমে যাবে। সম্প্রতি পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক নেতা ও ভোটাররা দুই মেয়র প্রার্থীকে নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। কাউন্সিলর প্রার্থীদের কেউ খোঁজ রাখেননি।তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমানে উপজেলায় চলছে চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সাংসদের দ্বন্দ্ব। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্বার্থ অনুযায়ী কখনো চেয়ারম্যানের পক্ষে, কখনো সাংসদের পক্ষ নেন। আর ভাইস চেয়ারম্যানদের কোনো কাজ না থাকায় তাঁরা এক অর্থে আর এলাকাতেই নেই। এভাবে চলতে থাকলে কখনো দেশের উন্নয়ন হবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কর্তৃত্ব পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যস্ত করা উচিত বলে মনে করেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, পরিষদ বা করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্বে নির্বাচন করবে, নাকি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের চাহিদার পত্রের জন্য অপেক্ষা করবে, সে বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা নেই। তবে রেওয়াজ অনুযায়ী কমিশন মন্ত্রণালয়ের চিঠির অপেক্ষায় থাকে। এ বিষয়ে আইন সংশোধন করে নির্বাচনের পুরো কর্তৃত্ব কমিশনের কাছে দেওয়া উচিত।