
গরমে বৈদ্যুতিক পাখার বাতাস। ফ্রিজের ঠান্ডা পানি। আঁধার ঘুচে গিয়ে দিন-রাত প্রায় একাকার। আলেয়া খাতুনের পারিবারিক জীবনে এখন ঝঞ্ঝাট অনেক কমে এসেছে। গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। বাচ্চাদের লেখাপড়ায়ও অনেক সুবিধা।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলীর গৃহবধূ আলেয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, বিয়ের পর তিনি যে শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন, সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। সচ্ছল গৃহস্থ ঘর হলেও বিদ্যুৎহীন জীবনযাপনের কষ্ট মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। এখন সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে ছোট্ট শিশুটি গরমে কষ্ট পায় না।
তবে সৌরবিদ্যুৎ বলতে সাধারণভাবে মানুষের যে ধারণা, পাড়াতলীর সৌরবিদ্যুৎ তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। সেখানে বাড়িতে বাড়িতে ঘরের চালায় সৌর প্যানেল বসানো নেই। ঢাকা কিংবা অন্য যেকোনো এলাকার মতো লোডশেডিংয়ের উৎপাতও নেই। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের মতো কংক্রিটের খুঁটিতে ঝোলানো তারের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে সৌরবিদ্যুৎ।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পাড়াতলী ইউনিয়ন প্রমত্তা মেঘনা ও তিতাস পরিবেষ্টিত একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কিন্তু ক্ষুদ্র গ্রিডে সরবরাহ করা সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে সেখানকার মানুষ আধুনিক জীবনযাত্রা থেকে এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, পিছিয়েও নেই।
উপজেলার পান্থশালা ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত বড় নৌকায় প্রমত্তা মেঘনা পাড়ি দিয়ে পাড়াতলীতে পৌঁছে আমরা একটু অবাকই হই। কংক্রিটের খুঁটির মাথায় মোটা তার বসিয়ে গ্রামের পর গ্রাম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতে চলছে কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজ—সবই। এমনকি পানি তোলা, ওয়েল্ডিং করাসহ সব ভারী যন্ত্রপাতিও চালানো হয় এই বিদ্যুতে। ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
এর মাধ্যমে দেশে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পদ্ধতি ও প্রযুক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। প্রথম পর্যায় বাড়িভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (সোলার হোম সিস্টেম) ব্যবহারের পদ্ধতি ইতিমধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ বাড়িতে স্থাপিত হয়েছে।
পাড়াতলীতে ক্ষুদ্র গ্রিডে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। এর উদ্যোক্তা শেফা এনার্জি অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এই কোম্পানির একটি প্রকল্প হচ্ছে ‘সৌর বাংলা ১৪১ কিলোওয়াট পিক সোলার মিনি গ্রিড’। উদ্যোক্তা বেসরকারি কোম্পানি হলেও সরকার যে প্রক্রিয়ায় বাড়িভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্যানেল স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সেই একই প্রক্রিয়ায় এই মিনি গ্রিড প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রক্রিয়াটি হলো, সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)’ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কিছু বেসরকারি সংস্থাকে তালিকাভুক্ত করে। এই সংস্থাগুলোকে বলা হয় পিও (পার্টনার অর্গানাইজেশন)। ইডকল তার এসব পিওকে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ঋণ ও অনুদান দেয়। পিওগুলোও কিছু অর্থ বিনিয়োগ করে। প্রকল্পের কলেবর, বিদ্যুতের দাম সবকিছু ইডকলের তত্ত্বাবধানেই নির্ধারিত হয়। পাড়াতলীর ক্ষুদ্র গ্রিড প্রকল্পে ইডকলের পিও শেফা এনার্জি।
১৪১ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ইডকলের মাধ্যমে জার্মানির বৈদেশিক সহায়তা ব্যাংক কেএফডব্লিউ অনুদান হিসেবে দিয়েছে অর্ধেক, অর্থাৎ ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংক ঋণ হিসেবে দিয়েছে ১ কোটি ৯৯ লাখ। অবশিষ্ট ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে উদ্যোক্তা কোম্পানি বা পিও।
গ্রাহকের জন্য সরবরাহ করা হয়েছে প্রি-পেইড মিটার। সেই মিটারে বাটন টিপে দেখা যায় কত টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করা বাকি আছে। সে অনুযায়ী হিসাব করে প্রত্যেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যালয়ে এসে কার্ড রিচার্জ করিয়ে নেন। বাড়ি গিয়ে কার্ডটি মিটারের নির্দিষ্ট স্থানে ঢোকালেই মিটারে রিচার্জ করা টাকা যুক্ত হয়ে যায়।
তবে এত সুবিধার মধ্যেও গ্রাহকের একটা অভিযোগ আছে। সেটা হলো, এই বিদ্যুতের দাম বেশি, প্রতি ইউনিট প্রায় ১০ টাকা। পাড়াতলী গ্রামের মো. ইউসুফের বাড়িতে তিনটি ফ্যান চলে ও পাঁচটি বাতি জ্বলে। তাতে প্রতি মাসে রিচার্জ করতে হয় প্রায় দেড় হাজার টাকা। সিংগ্রাপুর গ্রামের হাজি সুরুজ মিয়া একটি ফ্যান চালান। বাতি জ্বালান দুটি আর মোবাইল ফোন চার্জ দেন। তাঁকে রিচার্জ করতে হয় প্রায় ৭০০ টাকার।
অবশ্য যাঁরা ব্যবসা করেন তাঁদের পোষায়। সিংগ্রাপুরের নাজির হোসেন চারটি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নামিয়েছেন। সব কটিই ভাড়া দিয়ে দেন। রাতে ব্যাটারি চার্জ করেন। তিনি বলেন, চারটি ব্যাটারি চার্জ করতে প্রতিদিন গড়ে বিদ্যুৎ বিল হয় ৮৪০ টাকা। প্রত্যেক চালককে দেন উপার্জনের এক-তৃতীয়াংশ। রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও কিছু ব্যয় হয়। এসব বাদ দিয়ে প্রতিদিন তিনি একেকটি যানের জন্য হাতে পান ৪০০ টাকা। চারটির জন্য প্রতিদিন পান ১ হাজার ৬০০ টাকা। তাই বিদ্যুৎ বিল নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই।
গ্রাহকদের যেমন বিল নিয়ে অভিযোগ, তেমনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তার আশঙ্কা গ্রিডের বিদ্যুৎ নিয়ে। যদি কখনো ওই এলাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ যায়, তখন তাদের কী হবে! তাদের কি এই কেন্দ্র গুটিয়ে চলে যেতে হবে?
গ্রাহকের অভিযোগ ও উদ্যোক্তার আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য সিদ্দিক জুবায়ের প্রথম আলোকে বলেন, দামের বিষয়টি আপাতত কিছু করার সুযোগ নেই। একপর্যায়ে হয়তো দাম কিছুটা কমবে। আর উদ্যোক্তাদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা, সৌরবিদ্যুতের ক্ষুদ্র গ্রিডের এলাকায় জাতীয় গ্রিড পৌঁছালে দাম দিয়ে সৌরবিদ্যুৎ কিনে নেবে সরকার এবং তখন উদ্যোক্তারা তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবে।
শুরুতে এই প্রকল্পে গ্রাহক ছিলেন ৩০০, যা এখন হয়েছে ৬৬০। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক ৫৩৫, দোকান ১০৬, মসজিদ ১৩, স্কুল ৪ ও অফিস ২টি। প্রত্যেক গ্রাহককে মিটারসহ সংযোগ নেওয়ার জন্য এককালীন দিতে হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা।
বর্তমানে আরও অনেক গ্রাহক সংযোগ চাইছেন। কিন্তু কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা না বাড়িয়ে আর সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক শাহরুখ বিন রশীদ। তিনি বলেন, তাঁরা ১৪০ কিলোওয়াট পিক ক্ষমতার আরেকটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কেন্দ্রটির নকশা করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী। তিনি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণে ইডকলকে কারিগরি সহায়তাও দিয়ে থাকেন।
স্থাপনের জন্য ৬৭ শতাংশ জায়গায় সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে। এই প্যানেলের মাধ্যমে পাওয়া যায় ডাইরেক্ট কারেন্ট বা ডিসি বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা বিপজ্জনক। তাই ইনভার্টার নামের একধরনের যন্ত্র বসিয়ে ওই ডিসি বিদ্যুৎকে এসি (অলটারনেটিভ কারেন্ট) বিদ্যুতে রূপান্তর করে বিতরণ লাইনে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রটির ২৮৮টি বিশালাকার চার্জার ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুৎ দিয়ে ওই এলাকায় তিন দিনের বর্তমান চাহিদা মেটানো সম্ভব। মোট ৩০০ কংক্রিটের খুঁটির ওপর প্রায় আট কিলোমিটার তার বসিয়ে চারটি ফিডারে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
কেন্দ্রটিতে ব্যবস্থাপক ছাড়া একজন সহকারী ব্যবস্থাপক, একজন টেকনিশিয়ান ও দুজন তত্ত্বাবধানকারী (একজন দিনের ও একজন রাতের জন্য) রয়েছেন। এই পাঁচজনই কেন্দ্রটি চালান।
স্রেডার সদস্য সিদ্দিক জুবায়ের বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের মোট ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। এগুলোর সর্বমোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় দেড় মেগাওয়াট। সৌরবিদ্যুতের মেগা গ্রিড চালুও প্রক্রিয়াধীন। সেই বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে। ২০২১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মোট ৩ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে স্রেডা। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎই হবে প্রধান।
সরকারি হিসাবে বর্তমানে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য, ২০২০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ১০ শতাংশে এবং ২০৩০ সালে ২০ শতাংশে উন্নীত করা।