খুদে আসমার পাঠশালা

ছায়া ঘেরা বাড়ির আঙিনায় চট বিছিয়ে বসে আছে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। ওদের কেউ লিখছে, কয়েকজন পড়ছে, অন্যরা পড়া বুঝে নিচ্ছে। এসব শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছে আরেক খুদে শিক্ষার্থী আসমা আকতার। আসমা এবার পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেছে। নিজের পড়াশোনার ফাঁকে প্রতি শুক্রবার আসমা তাঁর সহপাঠী ও নিচের শ্রেণির পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের বিনা পয়সায় পড়াচ্ছে।
বরগুনা জেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে আয়লা-পাতাকাটা ইউনিয়নের আঙুলকাটা গ্রাম। বরগুনা-পুরাকাটা আঞ্চলিক মহাসড়ক পার হয়ে কদমতলার দিকে একটা সরু পথ গেছে। সেটি ধরে একটু উত্তরে এগোলেই রাস্তার পাশে আসমাদের বাড়ি। সেখানে পড়ছিল দক্ষিণ ইটবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির তন্ময় রায়। তন্ময় বলে, গণিত ও অন্যান্য বিষয়ে বুঝতে না পারলে সে আসমার কাছে আসে। আসমা তাকে বুঝিয়ে দেয়।
একই কথা জানাল লাঙ্গলকাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ, মারিয়া আকতার, হাফসা, দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নান্টু, শামিম, সুমাইয়া।
আসমা স্থানীয় বুড়িরচর এমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। এটিতে প্রাথমিক শাখাও আছে। প্রথম শ্রেণি থেকে পরীক্ষায় আসমা প্রথম হয়ে আসছে। তৃতীয় শ্রেণি থেকেই সহপাঠীদের পড়াশোনায় সাহায্য করছে আসমা। পরে ছোটরাও আসা শুরু করে তার কাছে। সেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলও করে। তা দেখে অভিভাবকদের মধ্যে আসমার প্রতি আস্থা জাগে।
ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এসব শিশুর অভিভাবকদের তাঁর সন্তানকে শিক্ষকদের টাকা দিয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। তাই বিনা পারিশ্রমিকে আসমা প্রতি শুক্রবার তাদের পড়াচ্ছে। এখন তার পাঠশালায় শিক্ষার্থী সংখ্যা ১২ জন। আসমাও নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা করছে। সে বলে, এসবে তার পড়াশোনার ক্ষতি হয় না। বরং ওদের সঙ্গে সে নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারে।
এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক কালাম খাঁ বলেন, ‘আসমা না অইলে আমার মেয়েটার পড়াশোনাই অইত না। একে তো আমরা গরিব, তার ওপরে এইহানে প্রাইভেট পড়ানোর মতো কোনো স্যার নাই। ছোট্ট মেয়েটা আমাগো যে কত উপকার করতে আছে কইয়্যা বুঝাইতে পারমু না। ’
আসমার বাবা আবু বকর দিনমজুর। তিন মেয়ে নিয়ে তাঁর পাঁচজনের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। কখনো কখনো দিনে এক বেলাও খাবার জোটে না। কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা ছাড়তে দেননি। আবু বকর বললেন, ‘মানসে যহন আমার মেয়ের উপকারের প্রশংসা করে তহন সব কষ্ট ভুইল্লা যাই। মনডা খুশিতে ভইর্যান ওঠে।’
বাবার কথা শুনে আসমা বলে, ‘আমি একা না, সবাইরে নিয়া বড় হইতে চাই, মানুষ হইতে চাই। এই জন্য সহপাঠী ও ছোট ভাই-বোনদের পড়াই। এইটা আমার ভালো লাগে।’