গল্লামারীতে লাশের স্তূপ

>মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস সারা দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসররা চালায় নির্যাতন ও গণহত্যা। দেশের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয় অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবর। এগুলোর কোনো কোনোটিতে কয়েক হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে।

‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন খুলনা নগরের পাশের গল্লামারী এলাকায় কেউ যেতে সাহস করত না। স্বাধীন হওয়ার পরদিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সারি সারি লাশ। রাস্তার ধারে, বিলের মধ্যে, নদীতে শুধু গলিত, অর্ধগলিত লাশের স্তূপ। কোথাও দেখা যায় লাশ টানাটানি করছে শকুন আর কুকুর। এ অবস্থা দেখে সেখানে আর বেশিক্ষণ থাকতে না পেরে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসি।’ বলছিলেন খুলনার সাংবাদিক মনিরুল হুদা।
সম্প্রতি প্রথম আলোকে মনিরুল হুদা বলেন, তৎকালীন খুলনা বেতার কেন্দ্র ছিল বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। সেখানেই আস্তানা তৈরি করে পাকিস্তানি সেনারা। এ ছাড়া সার্কিট হাউস ও রেলস্টেশনে ছিল তাদের আস্তানা। এর পাশাপাশি ভূতের বাড়ি আনসার ক্যাম্প ছিল আলবদরের ঘাঁটি। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষকে তুলে নিয়ে আসা হতো এসব আস্তানায়। চলত কয়েক দিন ধরে নির্যাতন। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হতো গল্লামারী ও ফরেস্ট ঘাট এলাকায়। সেখানে তাদের গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হতো।
তিনি বলেন, প্রতিদিন এভাবে হত্যা করা হতো ২৫ থেকে ৩০ জনকে। কখনো আস্তানায় হত্যা করে ট্রাকে করে লাশ নিয়ে গিয়ে ফেলা হতো গল্লামারী নদী ও আশাপাশের জলাভূমিতে। একসময় ওই এলাকা লাশের স্তূপে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর শুধু গল্লামারী এলাকা থেকেই আট ট্রাক মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে গল্লামারীর মতো আর কোনো স্থানে এত অধিকসংখ্যক বাঙালিকে হত্যা করা হয়নি বলে মনে করেন মনিরুল হুদা।
১৯৭২ সালের প্রথম দিকে গল্লামারী এলাকায় একাধিকবার এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের লেখক সুকুমার বিশ্বাস। তিনি তাঁর একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবর বইতে লিখেছেন, ‘সেদিন গল্লামারীর বিস্তীর্ণ এলাকার যে বীভৎস রূপ দেখেছিলাম, তা আজ আর আমার পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। মানব ইতিহাসের করুণতম দৃশ্য যেন আর কোনো মানব সন্তানকে দেখতে না হয়।’
দেশ স্বাধীনের পরপরই খুলনার গল্লামারী এলাকায় গিয়েছিলেন ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি গ্রন্থে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘বিশাল প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের লাশ। শুধু প্রান্তরে নয়, আশপাশে ধানখেত ও পাটখেতেও ছড়িয়ে ছিল লাশ। বাতাসে পাটগাছ যখন এলোমেলো হচ্ছে, ফাঁক দিয়ে দেখি লাশের স্তূপ। কোনো লাশই তিন-চার দিনের পুরোনো নয়।’
ঠিক কতসংখ্যক মানুষকে গল্লামারী এলাকায় হত্যা করা হয়েছে, তা কেউ বলতে পারে না। বৃহত্তর খুলনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বইতে গৌরাঙ্গ নন্দী লিখেছেন, ‘গল্লামারী বধ্যভূমিতে কতজনকে হত্যা করা হয়েছিল, তা যেমন নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি, তেমনি এখানে কাদের হত্যা করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কারণ, সেই সময়ের খুলনা শহর থেকে দূরের অপেক্ষাকৃত নির্জন এই জায়গাটিতে মুক্তিযুদ্ধকালের শুরু থেকেই একেবারে শেষ পর্যন্ত মুক্তিকামী মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধকালে কেউই সেখানে যেতে সাহস দেখাননি। যুদ্ধ শেষে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন নরকঙ্কালের স্তূপ।’
অবহেলায় স্মৃতিসৌধ
গল্লামারী এলাকায় খুলনা-সাতক্ষীরা সড়কের বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে বাঁ পাশে ছোট পরিসরে নির্মাণ করা হয় ‘খুলনা গল্লামারী স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ’। ১৯৯৯ সালে জেলা প্রশাসন এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। স্মৃতিসৌধের পাশেই তৈরি করা হয় একটি মুক্তমঞ্চ।
এরপর ২০০৭ সালে জেলা পরিষদ উদ্যোগ নেয় ওই এলাকায় একটি আধুনিক স্মৃতিসৌধ নির্মাণের। ওই প্রকল্পের জন্য তিন একর খাস জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১১ সালে মূল স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন হলেও এরপর অর্থাভাবে থেমে আছে নকশার বাকি কাজ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি গল্লামারী স্মৃতিসৌধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মূল স্তম্ভের পাদদেশের চারপাশ মাটিতে দেবে গেছে। সামনের অংশটি ঢালাই দিয়ে কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় টাইলস ভাঙা। স্মৃতিসৌধের বিবরণ নেই কোথাও। শুধু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধনের তিনটি স্মারক উজ্বল হয়ে আছে সেখানে।
স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। মূল সড়ক থেকে স্মৃতিসৌধে প্রবেশের পথটি বাঁশ দিয়ে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর পুরোনো স্মৃতিসৌধ ও মুক্তমঞ্চটি রয়েছে পানির মধ্যে। অনেক দিনের অবহেলায় ভেঙে পড়েছে মুক্তমঞ্চের পাদদেশ। ইটগুলোও খুলে যাচ্ছে অনেক জায়গায়। চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছে গবাদিপশু।
স্মৃতিসৌধের তত্ত্বাবধায়ক হায়দার শিকদার বলেন, পুরো এলাকাটি অরক্ষিত হওয়ায় এখানে মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে মাদকসেবীদের সঙ্গে কয়েকবার মারামারিও হয়েছে। আর গেট না থাকায় ছাগল-গরু ঢুকে পড়ে যখন-তখন।
খুলনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ বলেন, যে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল, তা দিয়ে শুধু মূল স্তম্ভের কাজ
করা হয়েছে। এরপর বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে।