গাজীপুর সিটি নির্বাচন ঘিরে উৎসবের আমেজ

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার মাত্রা তত বাড়ছে। বাড়ছে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের ব্যস্ততা। চলছে পাড়া-মহল্লা, অলিগলি, বাসাবাড়িতে ভোটপ্রার্থীদের সরব পদচারণ, ভোটপ্রার্থনা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
সরকারি ছুটির দিনে বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রচার-প্রচারণা পাচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। গতকাল শুক্রবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। প্রতীক বরাদ্দের পর এটি ছিল দ্বিতীয় শুক্রবার। ছুটির দিন হওয়ায় বেশির ভাগ ভোটারও ছিলেন বাসাবাড়িতে। এ কারণে প্রার্থীদের গণসংযোগেরও লক্ষ্য ছিল যতটা পারা যায় ভোটারের কাছে যাওয়া। প্রধান দুই মেয়র পদপ্রার্থী, সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের প্রচারণায় গাজীপুর নগর গতকাল ছিল জমজমাট ও সরগরম। ভোটপ্রার্থনাকে ঘিরে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে এবার মেয়র পদে ৭ জন, ৫৭টি ওয়ার্ডে ২৫৪ জন কাউন্সিলর ও ১৯টি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৮৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এর মধ্যে ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদপ্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
প্রতীক বরাদ্দের পরপরই প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রধান সড়ক ও অলিগলি পোস্টারে ছেয়ে গেছে। প্রতিদিনই বেলা দুইটায় শুরু হয় মাইকিং। চলে রাত নয়টা পর্যন্ত। মেয়র পদপ্রার্থীরা মূলত পথসভায় ব্যস্ত থাকলেও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। প্রার্থীদের সমর্থকেরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে কার কত সমর্থন রয়েছে, তা প্রদর্শনেও ব্যস্ত এখন। এরই মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন হওয়ার অভিযোগও উঠছে।
মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম গতকাল টঙ্গীর সাতাইশ এলাকায় পথসভা করেন। ওই পথসভার সময় যানবাহন ও লোক চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তিনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আচরণবিধি অনুযায়ী, পথসভার অনুমোদন থাকলেও জনগণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে-এমন কোনো সড়কে পথসভা করা নিষিদ্ধ।
অভিযোগ অস্বীকার করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি পথসভা রাস্তায় করেননি। রাস্তার পাশে খোলা স্থানে করেছেন।
মেয়র পদে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সচিব ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী সাইয়্যেদুল আলম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে বড় বড় মিছিল করলেও প্রশাসন সেদিকে নজর দিচ্ছে না। গাড়িতে স্টিকার থাকলেও জরিমানা করা হচ্ছে না।
আচরণবিধিতে মিছিল ও শোভাযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা রকিব উদ্দিন মণ্ডল সাংবাদিকদের বলেন, সড়ক-মহাসড়কে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে সভা করা আচরণবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এসব বন্ধ করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে।

আ.লীগ ও বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থীর গণসংযোগ
গতকাল আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের টঙ্গী সাতাইশ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজের আগে তিনি মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন, ‘ভোট মানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, আবাসিক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সকল প্রকার নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। কেন্দ্রীয় সরকার এবং স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে এই সব সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। আপনাদের মাধ্যমে এলাকার সকল শ্রেণির মানুষের কাছে ভোট চাই। আপনাদের দোয়া, সহযোগিতা চাই।’
এর আগে জাহাঙ্গীর আলম সকাল থেকে ৫০ ও ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মোজাম্মেল হক সড়ক এবং সাতাইশ রোডে গণসংযোগ করেন। গাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে, সিকদার মার্কেট, বাইগার টেক, সাতাইশ রোডের ভিয়েলাটেক্স কারখানার সামনে, খরতৈল মোড়, সাতাইশ চৌরাস্তায় পথসভায় বক্তব্য দেন। সাতাইশ স্কুলে কমিটির আহ্বায়ক, সচিব এবং সদস্যদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করেন। বৈঠকে নেতারা তাঁর পক্ষে ঘরে ঘরে ভোট চাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
বিকেলে ৫৫ নম্বর ওয়ার্ডের মিলগেটে পথসভার মাধ্যমে প্রচারণার শুরু হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর। পরে নামাবাজার, মুন্নু গেট, স্টেশন রোড, নোয়াগাঁও, তিস্তার গেট, হকের মোড়, দত্তপাড়া চেরাগ আলী মার্কেটের সামনে পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সাংসদ কাজী মোজাম্মেল হক, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ইলিয়াস আহমেদ, অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন মহি, উপদেষ্টা জালাল উদ্দিন, টঙ্গী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রজব আলী প্রমুখ।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার জুমার নামাজ আদায় করেন সাবেক কাউলিতিয়া ইউনিয়নের গজারিয়াপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। নামাজের আগে তিনি মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি মুসল্লিদের কাছে ভোট ও দোয়া চান।
হাসান উদ্দিন সরকার সকাল থেকে সাবেক কাউলতিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালান। এ সময় তিনি পথসভায় বলেন, কেন্দ্রের ফলাফল কেন্দ্রেই ঘোষণা করতে হবে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত ফলাফল শিট হস্তগত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র পাহারা দেবেন ২০-দলীয় জোটের নেতারা। স্বাক্ষরিত ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে কোনো ভোট কর্মকর্তাকে বের হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি করেন তিনি।
পরে বিকেলে হাসান উদ্দিন গাজীপুরের শিমুলতলি এলাকায় গণসংযোগ করেন। এরপর তিনি হাতিয়ার, ভাওরাইদ, পোড়াবাড়ী বাজার, গজারিয়াপাড়া, বাংলা বাজার, ভীম বাজার, মাস্টারবাড়ী, কাউলতিয়া, জোলারপাড়, মিরেরগাঁও, সালনা, কাথোরা মৈশানবাড়ী বাজার, জলিশপুরে পথসভা ও গণসংযোগ করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক, কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়র ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান, গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইজাদুর রহমান, সাবেক কাউলতিয়া ইউপির চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন প্রমুখ।