ঘুরে ফিরে সেই সার্চ কমিটি

নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে বঙ্গভবনে সংলাপ করবেন রাষ্ট্রপতি।

  • সবার আগে সংলাপে অংশ নিতে ডাক পেয়েছে জাতীয় পার্টি।

  • রাষ্ট্রপতির চিঠি পেলে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেবে বিএনপি।

  • এবারও নির্বাচন কমিশন গঠিত হচ্ছে সার্চ কমিটির মাধ্যমে।

নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০ ডিসেম্বর সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সংলাপ শুরু হতে যাচ্ছে।

আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন যে কমিশন গঠিত হবে, এর অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। ফলে আগামী নির্বাচন কাদের অধীনে হচ্ছে, কীভাবে সেই কমিশন গঠিত হবে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এর আগের দুই দফায় (২০১২ ও ২০১৭ সালে) মূলত আওয়ামী লীগ এবং তাদের শরিক দলগুলোর পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়েই নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ছাড়া বিএনপি এই সংলাপে অংশ নেয় কি না, নিলেও তারা কী দাবি করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে সংলাপের চিঠি পেলে দলের স্থায়ী কমিটিতে এ নিয়ে আলোচনা হবে। বিএনপি সংলাপে যাবে কি না, সেটা বৈঠক করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে তিনি বলেন, ‘ইসি গঠন নিয়ে বিএনপি কথাই বলবে না। সিদ্ধান্ত হচ্ছে, নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে সেই নির্বাচনে বিএনপি যাবে না।’

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, আগের দুবার যেভাবে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এবারও সেভাবেই কমিশন গঠিত হবে। অর্থাৎ প্রথমে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করবেন। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতির নেতৃত্বে সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি। ওই কমিটি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে নির্বাচন কমিশনার হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নাম নেবে। সেসব নাম থেকে সংক্ষিপ্ত তালিকা রাষ্ট্রপতিকে দেবেন। সেই তালিকা থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চিঠি পাইনি। তবে রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে ২০ ডিসেম্বর বৈঠক হওয়ার বিষয়ে মেসেজ দেওয়া হয়েছে।’

সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

অবশ্য স্বাধীনতার ৫০ বছর হতে চললেও কোনো সরকারই এ–সংক্রান্ত আইন করেনি। ইসি গঠনসংক্রান্ত আইনের খসড়া তৈরি করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। খসড়া আইনের কপি সুজন সম্প্রতি আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে দিয়েছে। এ সম্পর্কে গত ২৮ নভেম্বর তিনি জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, ২০২২ সালে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে আইন করা সম্ভব হবে না। সংসদের আগামী বা তার পরের অধিবেশনে এই আইন নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এর আগে গত ১৩ অক্টোবর সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব মো. ইয়ারুল ইসলাম। তবে হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের অনেক শরিক দলও আইন প্রণয়নের পক্ষে বিভিন্ন সময় মত দিয়েছে।

১৪ দলের একটি শরিক দলের শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করে প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের ইসিতে দেখতে চায় সরকার। এ জন্যই আইনটি হচ্ছে না।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকেই সংলাপে ডাকবেন। দেশে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯। প্রথমে সংসদের প্রধান বিরোধী দলকে ডাকা হচ্ছে। এরপর সরকারঘনিষ্ঠ দলগুলোকে ডাকা হবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের দলগুলোকে ডেকে এরপর বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দলগুলোকে ডাকা হবে। আওয়ামী লীগকে বিএনপির আগে ডাকার সম্ভাবনা আছে।

বঙ্গভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

সরকারি সূত্র বলছে, বিএনপি আন্দোলনের মধ্যে আছে। অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় তারা নিশ্চয় নানা দাবিদাওয়া বা শর্ত জুড়ে দিতে পারে। এ জন্য সবকিছু বুঝে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।

সরকারের একজন মন্ত্রী নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপিকে প্রথমে ডাকলে তারা যদি অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির সংলাপটা হোঁচট খাবে। এ জন্য আগে সংলাপের গতি ঠিক করে এবং বিএনপির মনোভাব বুঝে তাদের সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, আগামী সপ্তাহে ইসি গঠনে সংলাপ শুরু হচ্ছে—এটা আওয়ামী লীগকে জানানো হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, চিঠি পেলে আলোচনা করে দলীয় প্রতিনিধিদল ঠিক করা হবে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর আগে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ৩১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রথমে সংলাপ করেন। এরপর বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে (তখন তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন) প্রধান করে সার্চ কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম চায়। এরপর তারা ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠায়। পরে কে এম নূরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদাৎ হোসেনকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।

১৪ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্রপতি সংলাপে ডাকবেন—এমনটা তাঁরা জানেন। তবে তাঁদের দিনক্ষণ জানানো হয়নি। ডাকলে গিয়ে নিজেদের মত দেবেন বলে তিনি জানান। নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের বিষয়ে তাঁরা বরাবরই সোচ্চার। কিন্তু সরকার তা করছে না। সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন গঠন মন্দের ভালো উদ্যোগ।

বর্তমান ইসির পাঁচ সদস্যের মধ্যে ১৪ দলের শরিক তরীকত ফেডারেশনের তালিকা থেকে তিনজন রয়েছেন। তাঁরা হলেন সিইসি নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী। ১৪ দলের একাধিক সূত্র বলছে, আগেরবার আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোন কোন নাম প্রস্তাব করতে হবে সে বিষয়ে শরিকদের অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এবার এখনো বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ কিংবা সার্চ কমিটিতে নাম দেওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের নির্দেশনা সব শরিক এবার একাবাক্যে মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, সংলাপ অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে বলেই মনে হচ্ছে। আশা করতে হয় অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে। অতীত অভিজ্ঞতা হলো নতুন এই পদ্ধতিতে আসা দুটি কমিশনই ব্যর্থ। এই দুটি কমিশন নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। একই পদ্ধতিতে আরেকটি কমিশন গঠনের আগে বলতে হবে, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের দায় কে নেবে? নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগকর্তা, নাকি যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন তাঁরা, নাকি উভয় পক্ষ?