‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল’ কাজে লাগানোর আহ্বান
চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত ২৪ মে পর্যন্ত করোনাভাইরাসে সংক্রমণ ছিল ৬২ থেকে ৬৬ শতাংশ। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এই জেলায় সংক্রমণের হার নেমে এসেছে ১০ শতাংশে। এই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা ছিল জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ। সবার মিলিত প্রচেষ্টার ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা সংক্রমণের হার কমানো গেছে।
আজ রোববার দুপুরে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভিজ্ঞতা বিনিময় নিয়ে এক ওয়েবিনারে এমন মন্তব্য করেন বক্তারা। ওয়েবিনারের আয়োজন করেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট বদিউল আলম মজুমদার ও জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সল।
ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ সামিল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনার সংক্রমণ বেড়ে গেলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে সামাজিকভাবে করোনা প্রতিরোধে কৌশল নির্ধারণ করা হয়। বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে পাড়া-মহল্লায় ৫০০টির মতো কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এসব কমিটি শারীরিক দূরত্ব মানা ও মানুষকে বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে নিরুৎসাহিত করতে কাজ করে। ফলে করোনার সংক্রমণ দ্রুত কমতে শুরু করে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে যে ২৩ জন করোনায় আক্রান্ত মারা গেছেন, তাঁরা কেউ করোনার টিকা নেননি বলে ওয়েবিনারে জানান সাংসদ সামিল উদ্দিন আহমেদ। করোনার দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মাত্র একজন ও এক ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন আক্রান্ত হন বলে তিনি উল্লেখ করেন। করোনার সময় ১ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে সময় শিবগঞ্জের ৬৬ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করায় শিবগঞ্জ উপজেলায় করোনার সংক্রণের হার দ্রুত কমে এসেছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল ভারতের সীমান্ত–সংলগ্ন হওয়ায় বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানান সামিল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ভারত থেকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের কোভিড নেভেটিভের সনদ থাকলেও বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের আইসোলেশনে রাখা হয়। ১৪ দিন পর তাঁদের কোভিড টেস্ট নেগেটিভ হলে তবেই তাঁরা ছাড়া পেতেন।
ওয়েবিনারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভিয়েতনাম ও আরও কয়েকটি দেশ তাদের রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে দেশের জনগোষ্ঠীকে একত্র করে করোনা মোকাবিলা করেছে এবং তারা সফল হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশ তাদের শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরও করোনা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এসব দেশে আত্মকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ক্রান্তিলগ্নে আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে একত্র করা ছাড়া বিকল্প নেই। এ জন্যই বলব, স্থানীয় সাংসদ থেকে শুরু করে ইউপি সদস্য পর্যন্ত সব জনপ্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ করতে হবে। সব মানুষের মাস্ক পরা, আইসোলেশনে থাকা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ইত্যাদি কার্যাক্রম নিশ্চিত করতে হবে।’
দুই সপ্তাহের মধ্যে কমবে আশা প্রকাশ করলেও আগামী ঈদে আবার বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরামর্শক মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, এ জন্য সবাইকে সতর্ক থাকবে হবে। করোনা রোগী যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই আইসোলেশন করতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল প্রশংসা করে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, সেখানে ব্যাপক হারে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে, আইসোলেশন করা হয়েছে। অন্য এলাকাতেও এই মডেল প্রয়োগের ওপর গুরুত্বরোপ করেন তিনি।
ওয়েবিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস করোনা রোগীর বাড়িতে লাল পতাকা টাঙানোর বিষয়ে স্থানীয় সাংসদ সামিল উদ্দিন আহমেদের কাছে জানতে চান। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, লাল পতাকা টাঙানো যাবে না। এটা ভয়ের কারণ। মানুষ যাতে ভয় না পায়। রোগী ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহব্যঞ্জক করতে হবে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনপ্রতিনিধিদের গঠনমূলক ও আস্থাশীল নেতত্বের ওপর গুরুত্ব দেন দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই যদি প্রত্যেকের সুরক্ষার জন্য কাজ করি, তাহলে আমাদের সবার সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।’
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সলের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে অন্যান্যের মধ্যে পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সৈয়দ মনিরুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।