শিমলার জাখু পাহাড়ের চূড়ায় অনবদ্য রাত

শাহীন বানরের পেছনে দৌড়াচ্ছে ওর টুপির জন্য। নতুন কেনা বাহারি টুপি মাথা থেকে ছোঁ দিয়ে নিয়ে গেছে এক বানর। শাহীন বানরকে তাড়া করছে আর বানর পেছনে ফিরে ভিলেন মার্কা ভেংচি দিচ্ছে। শাহীন খিস্তি মারছে আর বানরের পেছনে দৌড়াচ্ছে। আমরাও বেশ মজা নিয়ে এদের কাণ্ডকারখানা দেখতে লাগলাম।
বলছিলাম ২০১৭ সালের ভারত ভ্রমণের কথা। দেশের বাইরে সেবারই প্রথম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই ব্যাচ এবং শিক্ষকদের মিলিয়ে মোট ৫৭ জনের দল। ১৭ দিনের এত বড় ট্যুর আমার জীবনে এখনো সবচেয়ে দীর্ঘ।
প্রথমে কলকাতা হয়ে ট্রেনে ৩৭ ঘণ্টার ম্যারাথন কিন্তু মজাদার এবং স্মৃতিময় এক ভ্রমণ শেষ করে পৌঁছে গেলাম হিমাচল প্রদেশে। সেখান থেকে আরও ৫ ঘণ্টা জিপে করে পাহাড়ের রানি শিমলায়। প্রচণ্ড শীত, তাপমাত্রা তখন ৮ কি ১০ ডিগ্রি। হোটেলে ঢুকেই গরম পানি দিয়ে গোসল সেরে খেয়েদেয়ে এক ঘুমে দুপুর পার। ঘুম থেকে উঠে বের হলাম শিমলা শহর ঘুরে দেখতে। পাহাড়ে ঘেরা শহরের সবকিছুই কেমন যেন স্নিগ্ধ, ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করে।
শহরের মধ্যে শিমলা রিজ নামে একটি ট্যুরিস্ট স্পট আছে। ১০০ ফুট উঁচু পতাকাসহ দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিকৃতি সেখানে, ভারতের কিছু বীর সেনার স্মৃতিস্তম্ভ সদর্পে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের আবহাওয়া, মুক্ত ঝকঝকে রাস্তাঘাট, স্নিগ্ধ বাতাস আপনাকে ছুঁয়ে দেবেই। এত দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি নিমেষেই হারিয়ে যেতে বাধ্য। চোখ এবং মন উভয়েরই প্রশান্তি৷
বেশ কয়েকজন বন্ধুসহ ঘুরছিলাম, পরাগ, আরমান, অভি এবং আরও অনেকেই ছিল। হঠাৎ করে চোখ গেল একটা পাহাড়ের চূড়ার দিকে, পাহাড়ের চূড়া ভেদ করে হনুমানের সোনালি মূর্তি দেখা যাচ্ছে (হিন্দুধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান)। নিচ থেকে দেখেই বেশ অবাক হলাম সবাই। ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকে এগোতে লাগলাম। কিছু দূর সামনেই দেখা হলো ট্যুরের দায়িত্বে থাকা নাজমুল স্যার এবং মোবারক স্যারের সঙ্গে। ওনাদের সঙ্গে শাহীন এবং নাফসিউলও ছিল। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম পাহাড়ের চূড়ায় যাব। একটু এগোতেই অভি দাঁড়িয়ে পড়ল। ও একবার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কী ভাবল কে জানে, বলল ও যাবে না। অগত্যা কী আর করা, আমরা ৭ জনই এগোলাম।

কিছুদূর সামনে গিয়ে পাহাড় এবং মন্দিরের নামফলক পেলাম। জাখু পাহাড় এবং চূড়ায় জাখু হনুমান মন্দির। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৪৫৫ মিটার ওপরে! ভয় পেলাম না, ততক্ষণে সবাইকে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় পেয়ে বসেছে। ওঠা শুরু করলাম, মাটির রাস্তা এবং খুবই খাড়া কিছু কিছু জায়গায়। মাঝেমধ্যে হলকা দিয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও হচ্ছিল, সেই কারণে কিছু জায়গা বেশ পিচ্ছিল হয়ে আছে। ২০-২৫ মিনিট ওঠার পরেই সবাই হাঁপাচ্ছে। কারও খুব বেশি পাহাড় ট্রেকিংয়ের অভ্যাস নেই। আর কিছুদূর গিয়ে একটা বাড়ি দেখতে পেলাম, বাড়ির সামনে একটি ছোট্ট দোকান। আমরা পানি কিনলাম, আরও টুকটাক কিছু খাবারদাবার সারলাম। তবে মূল কথা বিশ্রাম নিলাম। সবাই একনাগাড়ে হাঁপাচ্ছে।
বিশ্রাম শেষে আবার ওঠা শুরু করলাম, ইন্ডিয়ান কাউকে পেলেই ধরে ধরে জিজ্ঞেস করছি ‘অর কিত না দূর ভাইয়াজি?’ ওরা জবাব দেয় ‘অর থোড়া, অর থোড়া’। পাহাড়ের নিচ থেকেই এই ‘অর থোড়া’ শুনছি। থোড়া আর শেষ হয় না! আর কিছুক্ষণ পরপরই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। আমাদের মধ্যে স্যার দুজনের অবস্থাই বেশ করুণ৷ আর নাফসিউলের, একটু স্বাস্থ্যবান হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে। সবাই এগোচ্ছি হাঁপাতে হাঁপাতে আর পাশ দিয়ে এক বয়স্ক নারী তরতর করে দেখি ওপরে উঠে যাচ্ছেন। আমরা সবাই কোমরে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ওই নারীর ওপরে ওঠার গতি আর নিজেদের গতি দেখে খানিকটা বিব্রত ছাড়া আর কী করার ছিল।
বেশি অর্ধেক উঠে যাওয়ার পর এক জায়গায় গিয়ে মোবারক স্যার বসে পড়লেন। উনি আর যাবেন না। তোমরা যাও বলে আমাদের এগোতে বললেন। আমরাও নাছোড়বান্দা, ওনাকে রেখে উঠব না। নাজমুল স্যারেরও বেশ কষ্ট হচ্ছিল, সেটা লুকিয়ে মোবারক স্যারকে তিনি মোটিভেট করা শুরু করলেন। যাক শেষমেশ স্যার আবার সাহস এবং শক্তি ফিরে ফেলেন, আমরাও উঠতে লাগলাম। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, চারদিকে অন্ধকার ছেয়ে যাচ্ছে। রোড ল্যাম্প খুব কম থাকায় মোবাইলের ফ্লাশের আলোয় পথ দেখে নিতে হচ্ছে মাঝেমধ্যে।

তবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম ছিল শাহীন, সবাইকে পেছনে ফেলে ও মন্দিরে পৌঁছে আমাদের ডাকছিল। আমরাও শেষতক উঠলাম। উঠেই দেখি শত শত বানর। গাছের ডালে, হনুমানের মূর্তির চারদিকে শুধু বানর। শাহীন সবার আগে ওপরে পৌঁছার খেসারত হিসেবে বানরের পেছনে ছুটছে। ওর টুপি বানর মাথায় পড়ে আছে, তা দেখে একচোট হেসেও নিলাম। এত বানর দেখে বেশ ভয়ও পাচ্ছিলাম, কেউ পকেট থেকে মোবাইল বের করে ছবি তুলতেও সাহস করছিলাম না পাছে বানর খাপ দেয়।
বেশ সাহস করে মোবাইল বের করলাম শেষ অব্দি। এত কষ্ট করে ওপরে উঠলাম অথচ ছবি তুলব না তা তো হয় না। তবে মোবাইল দুহাতে প্রায় পুরো অংশ হাত দিয়ে ঢেকে রেখে সেবারই প্রথম ছবি তোলার অভ্যাস করলাম সবাই। মাঝে একদল বানর এসে ঘিরে ধরল আমাদের, কিছুক্ষণ কাঁইকুঁই শব্দ করে আমাদের ভয় দেখাল। নাজমুল স্যার একটু সামনে গিয়ে ওদের একচোট খিস্তি দিয়ে এলেন, এ দেখে ওরা আরও আগ্রাসী হলো। আমরা আরেকটু ভয় পেলাম। বেশ কিছুক্ষণ আটকে থেকে বানরের বেষ্টনী থেকে নিজেদের মুক্ত করে বুক ফুলিয়ে কিছুক্ষণ ছবি তুললাম হুড়োহুড়ি করে (অবশ্যই মোবাইল ঢেকে রেখে)। বুকের ছাতি আরও কয় ইঞ্চি ফুলে গেল যখন দেখলাম শাহীন বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাতে বানর থেকে উদ্ধারকৃত টুপি নিয়ে চওড়া হাসি দিতে দিতে আসছে। সোনালি রঙের হনুমান মূর্তি পুরোটাই সোনার নাকি শুধু সোনার প্রলেপের তা নিয়ে তর্কটা বেশি জমে উঠতে পারেনি ওই বানরের কারণেই।

এবার নামার পালা, রাত হয়ে আসছিল। পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নামাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তবে মন্দির থেকে বের হয়ে নামার রাস্তা ধরার আগে সবাই মিলে বানর প্রজাতিকে বান্দরসহ আরও কিছু কুৎসিত খিস্তি মেরে আসতে ভুললাম না। নামা শুরু করতে না করতেই বৃষ্টি শুরু হলো, কয়েকজনের কাছে ছাতা ছিল। আমি আজীবনই ছাতা ছাড়া মানুষ, তাই আমার কোনো ছাতা নেই। তবে অন্যের ছাতার নিতে আশ্রয় নিতে খুব একটা লজ্জা হয় না। আরমানের বাড়ি এবং স্বভাব দুইটাই নোয়াখালীর হওয়া সত্ত্বেও আমাকে কিছুক্ষণ আশ্রয় দিয়েছে ওর ছাতায়। কিছু পথ হালকা ভিজে নিজেকে অ্যাডভেঞ্চারার হিসেবে জাহির করতেও ছাড়লাম না।
বিপত্তিটা হলো মাঝামাঝি নেমে আসার পর। বৃষ্টি থেমে গেল, বিজলি চমকানো শুরু হলো। পাহাড়ের একটা ঢিবি থেকে পুরো শহরকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। বিজলি চমকানোর আলোয় অপরূপ লাগছিল, মোবাইলের ক্যামেরায় তা ধরার ব্যর্থ কিছু চেষ্টা করলাম। স্যারদের তাড়া খেয়ে আবার নামা শুরু করলাম। কিছুদূর যেতেই শিলাবৃষ্টি শুরু হলো। আমরা তখন খাড়া পাহাড় বেয়ে নামছি, মেঠোপথ। প্রথম দিকে শিলা ছোট ছোট সাইজের পড়ছিল, আমরা মাটিতে বসে, বিভিন্ন গাছ লতাপাতা ধরে নিচে নেমে যাচ্ছি কোনো একটা আশ্রয়ের আশায়। পেছনে ভিজে একাকার। এর মাঝেই বড় বড় শিল পড়া শুরু হয়ে গেল। ছাতার নিচে দাঁড়িয়েও কোনো উপায় হচ্ছিল না, দেখা গেল পাশেরজনের ছাতার ছাদ থেকে ড্রপ খেয়ে সরাসরি মুখ থেঁতলে দিচ্ছে, চোখ খোলা রাখাই দায়। একটু নিচে নেমেই একটা বাড়ির গেটের ছোট একটা ছাউনির নিচে দাঁড়ালাম কোনোমতে। সবার জায়গা হচ্ছিল না। মাথা বাঁচাচ্ছি, ওদিকে পায়ের অবস্থা যাচ্ছেতাই, মোজা, জুতা সবকিছুর ভেতরে বরফ ঢুকে গেছে। শিল পায়ে পড়ছে আর সবাই আহ্ উহ্ শব্দ করছি, ব্যথা থেকে বাঁচতে পা সরিয়ে নিয়েও লাভ হচ্ছে না। তবে এর মধ্যে অদ্ভুত এক খেয়াল এল যদি এই বরফের মধ্যে একটু গড়াগড়ি দিতে পারতাম! ঠান্ডার ব্যাপকতায় এই চিন্তা মাথা থেকে বিদায় দিলাম। এদিকে হাত–পা জমে যাচ্ছে, মুখ খুলতে পারছি না, সব জমে যাচ্ছে। নিজের মুখে নিজেই হাত দিতে পারছি না, এত ঠান্ডা। সবাই কাঁপছিলাম। মাটিতে বসার কারণে পশ্চাদ্দেশও ভিজে একাকার, সব দিকে হিমশীতল ছোঁয়া। মাঝে কীভাবে যেন কার ছাতার ছাদে বাড়ি খেয়ে কয়েকটা শিল জায়গামতো পৌঁছে গেল, ব্যস ষোলো কলা পূর্ণ হলো নিজেকে অনুভব না করার। নিজের ছাতা না থাকার অভাব হাড়ে হাড়ে টের পেলাম যদিও হাড় বা মাংস আলাদা করে ঠাহর করতে পারছিলাম না। সবারই একই অবস্থা, এত ভারী শিলাবর্ষণ কি ছাতা মানে! সবার শরীরেই বরফের শীতল ছোঁয়া, কোনো কিছু অনুভব করাই দায়!

শিল পড়া একটু কমে এলে আবার নামা শুরু করলাম। এখন আরও কঠিন হয়ে গেল নামা, বরফ গলে পানি হয়ে ঝরনার মতো পাহাড় থেকে ঢল নামছে। দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল, বরফের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, মনে হচ্ছিল সাদা দুধ গড়িয়ে পড়ছে। তবে তা এত ঠান্ডা যে হাত লাগলেই ছ্যাঁত করে উঠছিল। আবার শিলাবৃষ্টি শুরু হওয়ার ভয়েই আমরা এগোতে থাকলাম, মাটিতে বসে, দুই হাত ঠান্ডা বরফের মতো পানিতে ভর ভর দিয়ে নিচে নেমে এলাম! হাতের চামড়া বৃদ্ধদের মতো কুঁচকে গেছে, হাত এত ঠান্ডা হয়ে আছে যে আইসব্যাগের কাজ করা যাবে হাত দিয়ে।
নিচে নেমে এসে একটা ছাউনির মতো স্পটে এসে দাঁড়ালাম, সবার আগে সবাই মোজা–জুতা খুলে বরফমুক্ত হয়ে নিলাম। শিমলা রিজের চওড়া রাস্তা দেখতে পাচ্ছি, পুরো রাস্তা সাদা বরফে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। কাঁপুনিতে কেউ কোনো কথা বলতে পারছি না, হাত-পা পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে। হাত–পা ভাঙা ছাড়া নিচে নেমে আসতে পারায় নিজের অভিনন্দন জানাতে কিছুক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে লাফালাম, ঠান্ডা কমানোর একটা উপায়ও বটে। কিছুক্ষণ পরপর বিজলি চমকাচ্ছে আর সাদা বরফে ঢাকা রাস্তা মুক্তোর মতো ঝিলিক দিচ্ছে।

বরফে আচ্ছাদিত শহরটাকে ১৮ বছরের তরুণীর চেয়েও মোহনীয় লাগছিল, এত অপরূপ দৃশ্য জীবনে প্রথম দেখলাম। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও মন আনন্দে উদ্ভাসিত। সাতজনের এই পাহাড় বেয়ে ওঠানামার স্মৃতিটাই আজতক আমার শ্রেষ্ঠ ট্রেকিং। এরপর অনেক পাহাড়ে-জঙ্গলে ট্রেকিং করেছি, কিন্তু জাখু পাহাড়ের এই স্মৃতি অম্লান হয়নি একবিন্দুও। পাহাড়ের প্রেমে পড়ার পেছনে এই জাখুর অভিযানের ভূমিকা আছে। আর বরফ? আমি বারবার এমন বরফশীতল পথে হেঁটে যেতে চাই। তবে এবার আর গড়াগড়ি না দিয়ে ফিরব না।