জালালাবাদ পার্ক হচ্ছে 'বন্দী' উদ্যান

সিলেট নগরে সিটি করপোরেশনের উদ্যান বলতে একটিই, নাম জালালাবাদ পার্ক। নগরের কেন্দ্রস্থলে ৯৪ শতক জায়গার ওপর গড়ে ওঠা উদ্যানটির একদিকে সিলেট সার্কিট হাউস, আরেকদিকে জেলা পরিষদ। সামনে ঐতিহ্যবাহী কিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়িঘর। একসময় শুধু সীমানাপ্রাচীর-ঘেরা ছিল উদ্যানটি। পরে ফটক নির্মাণ করে হাঁটাচলার ব্যবস্থা করা হয়। হাঁটার উদ্যানটি এবার রূপান্তর করা হচ্ছে শিশুপার্কে।
প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিশু বিনোদনসামগ্রী স্থাপন করার শুরুতে উদ্যানের সম্মুখভাগে নতুন করে ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু দেয়াল নির্মাণ করার কাজ চলছে। এ অবস্থায় খোলামেলা একটি উদ্যান দেয়াল দিয়ে ‘বন্দী’ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা।
আগে উদ্যানে প্রবেশ না করেই ভেতরে কী হচ্ছে সবই চলতিপথে একনজর দেখা যেত। বাইরে থেকে পুরো উদ্যান দেখার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল সীমানাপ্রাচীর। সেই উদ্যান অনেকটা বন্দী করে দেয়াল নির্মাণের পরিকল্পনায় সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী জালালাবাদ পার্ক হাঁটার উদ্যান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রায় দুই বছর মেয়র পদ ছাড়া থাকার সুযোগে নাগরিকদের মতামত না নিয়েই এমন অনেক কাজ সিটি করপোরেশন করেছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, উদ্যানকে উদ্যানের মতো রাখতে হবে। শিশু বিনোদনসামগ্রী বসানো হোক। কিন্তু কয়েদখানার মতো বন্দী করে কেন?
সিলেট পৌরসভা থাকার সময় থেকে জালালাবাদ পার্ক ছিল শুধু নামেই। অনেকটা পরিত্যক্ত জায়গার মতো থাকায় ভবঘুরেদের আশ্রয় ছিল এটি। সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর থেকে জালালাবাদ পার্কের জায়গা সুরক্ষিত করে উদ্যানে রূপ দেওয়ার দাবি ওঠে। ২০১০ সালের দিকে সীমানা নির্ধারণ করে ফটক নির্মাণ করা হয়। তখন উদ্যানে ভবঘুরেদের যাতায়াতও নিয়ন্ত্রিত হয়। ওই বছরের জানুয়ারিতে উদ্যানটি নাগরিকদের হাঁটাচলার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, প্রকৌশল দপ্তরের তদারকির মধ্যে উদ্যানকে শিশুপার্কে রূপান্তরের কাজ চলছে। শেষ হবে আগামী জুন মাস নাগাদ। আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিশুদের বিভিন্ন রাইড স্থাপন শুরু করা হবে।
হাঁটাচলার উদ্যান হঠাৎ বাণিজ্যিক শিশুপার্কে রূপান্তর কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, হঠাৎ করে নয়, গত বছরের আগস্ট মাসে মাসিক সমন্বয় কমিটির সভায় এ ব্যাপারে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পর রূপান্তরের কাজ করা হচ্ছে। রাজধানীর শ্যামলী শিশুপার্ক দেখে সেভাবে রূপান্তর করার কাজ চলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী সিটি করপোরেশনের এ উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শহরে বেসরকারিভাবে পরিচালিত আরও শিশুপার্ক আছে। সেগুলোতে রাইড বসাতে গিয়ে রীতিমতো স্থায়ী স্থাপনা করতে দেখা গেছে। ওসমানী উদ্যান নামের আরেকটি শিশুপার্ক দেখা গেছে ইজারা গ্রহণকারী ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থায় খোলামেলা একটি উদ্যানকে শিশুদের দোহাই দিয়ে নিঃশেষ করার আয়োজন কি না, দেখার প্রয়োজন আছে।
তবে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেছেন, উদ্যানের ভেতরকার দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন না করেই শিশু বিনোদনসামগ্রী বসানো হবে। তাই উদ্যান উদ্যানের মতোই থাকবে। দেয়াল উঁচু করার কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমনিতেই সম্মুখ পুরোটা ভাসমান মানুষ ও ফুটপাতের পসরায় দখল থাকে। পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণে দেয়াল উঁচু করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।