ঝুঁকি কমেছে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই

মুশতাক হোসেন

সোয়াইন ফ্লু নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া রোগীর চেয়ে ওই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর বাস্তব সংখ্যা ৪০ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। করোনাভাইরাসের (কোভিড–১৯) ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে বলে চার মাস আগেই আশঙ্কা করেছিলাম। বাস্তবে আশঙ্কার চেয়েও অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন—সর্বশেষ গবেষণায় এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

ভারতের দিল্লির সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গত মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওই শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো সময়ে করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হয়েছিলেন। মে মাসের তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছিল। আর ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে করা গবেষণায় (জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী) এসেছে, এখানকার প্রায় অর্ধেক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের শরীরে অ্যান্টিবডির পরীক্ষা করে এই তথ্য পাওয়া হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা হার্ড ইমিউনিটির (গণ–রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠা) দিকে যাচ্ছি।

হার্ড ইমিউনিটি এখনো বিতর্কিত বিষয়। একজনের শরীরে কত দিন অ্যান্টিবডি কার্যকর থাকে, একবার আক্রান্ত হলে আবার দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কতটা আছে; তা নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। তাই যাঁরা আক্রান্ত হননি তাঁদের জন্য আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমেছে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যাঁর শরীরে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা শেষ হবে, তিনি আবার আক্রান্ত হতে পারেন। দেখা যাচ্ছে, যাঁরা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনেছেন তাঁরা তখন আক্রান্ত হননি। কিন্তু এখন না মানায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে গড়ে ৯০ শতাংশ মানুষ এখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি। অর্থাৎ তাঁরা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। ঝুঁকিতে থাকা সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। টিকার আশায় বসে থাকলে চলবে না। টিকা এলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, সেটাও ভাবার কারণ নেই। কারণ, টিকা সবার জন্য কার্যকর না–ও হতে পারে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, টিকা ৫০-৬০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। ফলে যাঁর শরীরে এই টিকা কার্যকর হবে না, তাঁর আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যাবে। তবে সরকারকে টিকার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে দেশের মানুষ দ্রুত টিকা পান।

গতকাল প্রকাশিত আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশের করোনার গতিপ্রকৃতি ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের করোনার গতিপ্রকৃতি একই রকম। তাই বিশ্বের অন্য দেশে আবিষ্কৃত টিকা আমাদের দেশেও কার্যকর হবে।

এমন অবস্থায় সরকারের উচিত হবে পরিকল্পিতভাবে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের কাজ চালিয়ে যাওয়া। শীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা। এ ছাড়া রোগী শনাক্ত করে তাঁকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনে রাখার ক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাসে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

মুশতাক হোসেন: পরামর্শক, আইইডিসিআর