ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে নিপুন বিশ্বাস এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে নীলফামারীর নরসুন্দর বাবার ছেলে নিপুন বিশ্বাস যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) ভর্তি হতে পেরেছেন।
আজ বুধবার মুঠোফোনে নিপুন বিশ্বাস প্রথম আলোকে বললেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারের সহযোগিতায় বিভাগের একটি সিট বাড়িয়ে আজ ভালোভাবেই ভর্তি হতে পেরেছি। এখন তো আমার বাবা-মা অনেক খুশি। এলাকাবাসীও দ্রুত বাড়ি যাওয়ার কথা বলছেন।’
গত ৩১ জানুয়ারি থেকেই নীলফামারীর ছেলে নিপুন বিশ্বাসের কথা ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। নিপুন বিশ্বাসও বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ভর্তির আশা প্রায় ছিলই না বলা যায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও ফেসবুকে বিভিন্নজনের লেখালেখির কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। তারপর নীলফামারী ও যশোরের জেলা প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, স্থানীয় সাংসদসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সহযোগিতায় তিনি ভর্তি হতে পেরেছেন। তাঁর ভর্তির পেছনে যুক্ত মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নিপুন বিশ্বাস।
নীলফামারী সদরে বাজারে অন্যের জায়গায় ছোট একটি দোকানে নরসুন্দর বা নাপিতের কাজ করেন নিপুন বিশ্বাসের বাবা। নিপুনের আরেক ভাই একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির অপেক্ষায় আছে। নিপুন বললেন, ‘আমার পরিবার থেকে আমিই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে পারলাম। আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়, দিন আনি দিন খাই আমরা। এখন আমি স্বপ্ন দেখছি, পড়াশোনা শেষ করে পুলিশের এসপি হব।’ নিপুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিলেন। কিন্তু সময়মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির সামনে হাজির হতে না পারায় তাঁর জায়গায় অন্য একজনকে ভর্তি করে নেওয়া হয়।
নিপুন বললেন, ‘আমার স্মার্ট ফোন নেই। ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেয়। ৩১ জানুয়ারি বেলা ১১টার মধ্যে ভর্তি হতে হবে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক বড় ভাই রাত দুইটার সময় ফোন দিয়ে ভর্তির বিষয়টি জানান। তখন আমি রংপুরে ছিলাম। ওই রাতেই কোনোভাবে টাকা ম্যানেজ করে ১৫ হাজার টাকায় মাইক্রোবাস ভাড়া করে যশোরের দিকে রওনা দিই। ওই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোন করে আমার অবস্থা জানিয়েছিলেন। আমার জন্য এক ঘণ্টা সময়ও বাড়িয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে আমার পৌঁছাতে পৌঁছাতে ১২টা ৮ মিনিট হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শুনি আমার পরিবর্তে আরেকজনকে ভর্তি করা হয়েছে। তখন আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।’
নিপুন জানান, মাইক্রোবাসের চালক ঢাকার দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁকে অনেক অনুরোধ করার পর তিনি নিতে রাজি হন। সারা রাস্তা চালককে জোরে চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু যানজট এবং সড়ক সংস্কার কাজের জন্য তাঁর পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। আট মিনিটের ফেরে পড়ে যান তিনি।
এই শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে ভর্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি বলার পর তাঁদের ভাষ্য ছিল, আর করার কিছু নেই। নিপুন বলেন, ‘তখন চিন্তা করতে থাকি, স্বপ্ন নিয়ে আসলাম, সব তো শেষ হয়ে গেল। বাবাকে কীভাবে মুখ দেখাব? ধার করা টাকা কেমনে শোধ করব?’
নিপুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যাম্পাসেই পায়চারি করছিলেন। এর মধ্যে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্নজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে থাকেন। কোনো একজন সাংবাদিক (নিপুন তাঁর পরিচয় জানেন না) এসে তাঁর ছবি ও অন্যান্য তথ্য নিয়ে যান। তারপর বিষয়টি ফেসবুকে আলোচনায় আসে। নিপুন জানালেন, তাঁর মুঠোফোনে কোনো খুদে বার্তা না পাঠানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আজ নিপুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যখন কথা হয়, তখন তিনি তাঁর পাশে দাঁড়ানো অসংখ্য মানুষের নাম বলতে থাকেন। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নিপুন বললেন, ‘করোনায় বাবার ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ যাচ্ছে। কেউ বাজারে এসে চুল কাটতে চান না। পড়াশোনার পাশাপাশি আমিও বাবার কাজে প্রায়ই সহযোগিতা করতাম। আর এ পর্যন্ত পড়াশোনা করার জন্যও ঋণ করতে হয়েছে বাবাকে।’
মঙ্গলবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পক্ষ থেকে নিপুন বিশ্বাসের ভর্তির বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনের বিশেষ নির্দেশে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন নিপুন বিশ্বাস। যথাসময়ে উপস্থিত হতে না পারলেও মানবিক দিক ও নিপুনের পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উপাচার্যের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে তাঁকে ভর্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার বিকেলে যবিপ্রবির উপাচার্যের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমিটির জরুরি সভায় নিপুন বিশ্বাসের ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত ৩০ জানুয়ারি ভর্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, সেখানে মেধাতালিকার একজন শিক্ষার্থী ছিলেন নিপুন বিশ্বাস। তাঁর মেধাক্রম ছিল ১৭।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিবহনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা সময়ে অর্থাৎ বেলা ১১টার মধ্যে নিপুন বিশ্বাস উপস্থিত হতে পারেননি। অনুষদের ভর্তি কমিটি নিপুন বিশ্বাসের ক্রমের পরবর্তী ক্রমের (মেধাক্রম ১৯) উপস্থিত শিক্ষার্থীকে ভর্তি করেন।
আজ মুঠোফোনে কথা হয় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিভাগটিতে ভর্তির জন্য তিনজনকে ডাকা হয়েছিল, যাঁদের মধ্য থেকে একজনকে ভর্তি নেওয়ার কথা ছিল। তিনজনের মধ্যে একজন উপস্থিত হননি। নিপুন বিশ্বাস সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি, তাই অপেক্ষমাণ আরেকজনকে ভর্তি নেওয়া হয়। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। পরে বিভিন্নভাবে বিষয়টি আমার কানে আসে। জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে অনেকেই আমাকে খুদে বার্তা ও ফোনে ছেলেটির বিষয়ে কিছু একটা করতে বলেন। আমার যেহেতু কিছু ক্ষমতা আছে, সেই ক্ষমতাবলেই একটি সিট বাড়িয়ে ছেলেটির ভর্তির ব্যবস্থা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’
উপাচার্য আনোয়ার হোসেন বলেন, আইন বলে নিপুন বিশ্বাসের ভর্তি বাতিলের বিষয়টি ‘সঠিক ছিল’। তবে বিষয়টিতে মানবিকতারও ব্যাপার আছে। নিপুন বিশ্বাস সমাজের অনগ্রসর পরিবারের একটি ছেলে। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে তাঁর বিষয়ে বেশ কিছু ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভর্তিতে ১৯ হাজার ৫০০ টাকার জায়গায় ১১ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। সমস্যাটির সুন্দর সমাধান হয়েছে।
নিপুন বিশ্বাসের মুঠোফোনে খুদে বার্তা না পাঠানো প্রসঙ্গে আনোয়ার হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের ওয়েবসাইটে খোঁজখবর রাখতে বলা হয়। করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়েরও খারাপ অবস্থা যাচ্ছে। অন্যদিকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষও করতে হবে। তবে খুদে বার্তা না পাঠানোর বিষয়টি ভুল হয়েছে। এ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় একটা শিক্ষাও পেল। ভবিষ্যতে এ বিষয়টি মাথায় রাখা হবে।