ডায়াবেটিসে আক্রান্তের তালিকায় বাংলাদেশ ৮৮তম

বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫৬তম। ৩৪ বছরে পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে খারাপ হওয়ায় বাংলাদেশ ৬৮ ধাপ পিছিয়েছে। গবেষণায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২০০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণাটিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা। এর সঙ্গে ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ৫০০ জন গবেষক এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের একজন বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান।
মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৯ দশমিক ৩ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন দীর্ঘস্থায়ী এই অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। শহরের মানুষের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি। গবেষকেরা বলছেন, শহরে প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। গ্রামে এই হার ৮ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বারডেম হাসপাতালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেছেন, দেশে ডায়াবেটিস রোগী আছে প্রায় ৭১ লাখ (সব বয়সী)। এই হিসাব আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের।
‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ট্রেন্ডস ইন ডায়াবেটিস সিনস ১৯৮০: আ পুলড অ্যানালাইসিস অব ৭৫১ পপুলেশন-বেসড স্টাডিজ উইথ ৪.৪ মিলিয়ন পার্টিসিপেন্টস’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রবন্ধ ৬ এপ্রিল প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট। দাবি করা হচ্ছে, এটি ডায়াবেটিস নিয়ে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় গবেষণা।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে পুরুষের চেয়ে নারীর মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বেশি। অন্যদিকে যারা স্থূলকায় বা যাদের ওজন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি, তাদের ২৪ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
গত তিন দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। ডায়াবেটিসের প্রকোপ বৃদ্ধিতে এসবের ভূমিকা আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) পুষ্টি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তাহমিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের (অবস্থান ১৪৬তম) তুলনায় বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বেশি। এর একটি কারণ হয়তো এই যে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ সচেতন হয়েছে বেশি। কিন্তু সে দেশেও সবার ক্ষেত্রে হয়নি। নিম্ন আয়ের মানুষ জাঙ্কফুড খায় বেশি, তাদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার বেশি।
পুষ্টি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তাহমিদ আহমেদ বলেন, শহরে বস্তির মায়েদের ও ধনীদের মধ্যে ডায়াবেটিস বেশি। ধনীরা বাসায় কাজ করেন কম। অন্যদিকে শহরে হাঁটা বা শরীরচর্চা করার সুযোগ সীমিত। খুব কমসংখ্যক স্কুলে খেলার মাঠ আছে। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকার দুই মেয়রের কাছে আবেদন জানাই, তাঁরা যেন পার্কগুলো মানুষের ব্যবহারের উপযোগী ও নিরাপদ করেন।’
ল্যানসেট-এর প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসের কারণে বছরে ব্যয় হচ্ছে সাড়ে ৮২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বৃহস্পতিবার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি অধ্যাপক মাহমুদ হাসান বলেন, দেশের সব ডায়াবেটিস রোগীকে চিকিৎসা দিতে স্বাস্থ্য বাজেটের এক-চতুর্থাংশ খরচ হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালে বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ কোটি ৮০ লাখ। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ কোটি ২০ লাখ। অর্থাৎ গত ৩৪ বছরে বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে চার গুণ।
গবেষকেরা দেখেছেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের হার সবচেয়ে বেশি আমেরিকান সামোয়া ও নাউরুতে। এই দুটি দেশে প্রতি তিনজনে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের অর্ধেক, অর্থাৎ ২১ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস করে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ায়। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ হবে ৭০ কোটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়াবেটিস হৃদ্যন্ত্র, রক্তনালি, চোখ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। ডায়াবেটিস প্রতিবন্ধিতা ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংস্থাটি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে আছে শরীরের ওজন ঠিক রাখা, নিয়মিতভাবে দৈনিক ৩০ মিনিট শরীরচর্চা করা, বেশি পরিমাণে সবজি ও ফলমূল খাওয়া, ধূমপান এড়িয়ে চলা ও মদ্যপান সীমিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি জানা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং ব্যবস্থাপত্র মেনে ওষুধ সেবন করা।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, পশ্চিমের দু-একটি দেশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া বৃদ্ধি বন্ধ করতে পেরেছে। কোনো দেশ আইন করে বলেছে, স্কুলের শিক্ষার্থীদের দেওয়া পানীয়তে কোনো ধরনের মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য মেশানো যাবে না। কোনো দেশ ফাস্টফুডে লবণের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। তিনি বলেন, দেশে শহরগুলোতে হাঁটার জন্য পার্ক, সাইকেল চালানোর জন্য পৃথক লেন করা দরকার। এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা দরকার।