ঢাকাইয়া ভাষার ব্যবহার কমছে

.
.

‘এক দেশে এক বাসসা (বাদশা) আছিল (ছিল)। বাসসার নাম আছিল সোপিয়ান বাসসা। বাসসার একমাত্র পোলা আছিল রাজকুমার সফর চান।’ ‘রাজকুমার সফরচান আর সোবুজ নিশা পরীর কিস্সা’ নামের লোককাহিনিটি পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দাদের কুট্টি ভাষায় লেখা। সুনির্দিষ্টভাবে ‘আদি বাসিন্দা’ শব্দটি বলা হলো। কেননা, এলাকাটিতে এখন শুধু আদি বাসিন্দাদেরই বাস নেই। গত চার-পাঁচ দশকে পুরান ঢাকার পুরোনো বাড়ির সঙ্গে ভাঙছে একান্নবর্তী পরিবারও। অনেক পরিবার ছড়িয়ে পড়েছে নতুন এলাকাগুলোতে। আবার দেশের নানা প্রান্ত থেকে রাজধানীমুখী নতুন মানুষ ডেরা বেঁধেছে পুরান ঢাকাতেও।
এখনকার ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে উভয় পাশের এলাকাগুলোকে পুরান ঢাকা বলা যায়। এসব এলাকার মধ্যে আছে চকবাজার, বেগম বাজার, বেচারাম দেউড়ি, মাহুতটুলী, বাবুবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, গেন্ডারিয়া, ওয়ারী, ইসলামপুর, কসাইটুলী ইত্যাদি।
পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের ভাষা মূলত দুই ধরনের। এর একটি ‘ঢাকাইয়া বাংলা’ এবং আরেকটি ‘ঢাকাইয়া উর্দু’ নামে পরিচিত। এই ঢাকাইয়া উর্দুভাষীদের ‘সুব্বাস’ নামেও পরিচিতি আছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পুরান ঢাকায় উর্দু বলতে যে ভাষার প্রচলন আছে, তা কখনোই শুদ্ধ উর্দু নয়। উর্দু শব্দের সঙ্গে এটি হিন্দি ও বাংলার মিশ্রিত রূপ।
‘পুরোনো ঢাকার ভাষা’ নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রাজীব হুমায়ুনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘পুরান ঢাকার অধিবাসীদের ভাষা তথা মাতৃভাষা আসলে বাংলা, “ঢাকাইয়া বাংলা”। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পুরান ঢাকার উর্দু অথবা হিন্দির একটি উপভাষা প্রচলিত রয়েছে।’
যে দুই ধারার ভাষার কথা বলা হলো, এর মধ্যে উর্দুমিশ্রিত ভাষার ব্যবহারটা এখন সবচেয়ে কম। এলাকার মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যেই এ ভাষার ব্যবহার ছিল। কিন্তু এখন এর ব্যবহার কেমন? পুরান ঢাকার একটি বনেদি পরিবারের সদস্য ও মাদার বখ্শ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আজিম বখ্শ বলছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে এখন আমার বড় দুই বোন ছাড়া আমি আর কারও সঙ্গে এ ভাষায় কথা বলতে পারি না। আমার সন্তানেরাও বলে না। আর আদি ভাষা কী বলব, আমার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তো বাংলাতেই কথা বলা যায় না। ইংরেজিতে বলতে হয়।’
পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারের বাসিন্দা আদি ঢাকাবাসী ফোরামের সদস্যসচিব জাভেদ জাহান এখনো তাঁর পরিবারে ‘উদুর্মিশ্রিত’ ভাষায় কথা বলেন। তিনি বলেন, এলাকায় বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার রয়েছে। উর্দুমিশ্রিত নয়, ঢাকাইয়া বাংলাতেই ছোটবেলা থেকে কথা বলতেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সেলিম। সিদ্দিকবাজারের পৈতৃক বাড়িতে তিনি এখনো থাকেন। কিন্তু এ ভাষায় একজন মাত্র মানুষের সঙ্গেই বলতে পারেন। তিনি আর তাঁর মা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক হাফিজা খাতুন পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দাদের অভিবাসন নিয়ে ‘ঢাকাইয়াস অন দ্য মুভ’ নামের একটি গবেষণা করেছেন। দেখা গেছে আদি বাসিন্দাদের বিক্রি করে যাওয়া বাড়িঘরের মধ্যে ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে নিজেদের আত্মীয় বা এলাকার মানুষ কিনেছেন। বাকি ৫৩ শতাংশ কিনেছে ঢাকার অ-আদিবাসী বা অন্যান্য জেলার মানুষ।
পুরান ঢাকার অনেকেই বলেন, এলাকার ভাষা নতুন প্রজন্ম ব্যবহার করতে আগ্রহী নয়। এর দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন আজিম বখ্শ। এর একটি শিক্ষার প্রসার, আরেকটি হলো সাহিত্য, চলচ্চিত্র বা অন্যান্য মাধ্যমে ভাষাটিকে হাস্যরসের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করায় এর প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষিত প্রজন্ম এই ভাষার ব্যবহার স্কুল-কলেজ বা কোচিং সেন্টারে করতে পারে না। কেননা সেখানে তো তার ভাষায় কথা বলার মানুষ সব সময় পায় না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজনীন বেগম স্মরণ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পরিচিতি ক্লাসে নিজেকে ঢাকাইয়া বলে পরিচয় দেওয়ায় হাস্যরস উঠেছিল। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা-মা বললেও নিজে আর বলতে পারি না। কেননা চর্চা নেই।’
কোনো শিল্পমাধ্যমে পুরান ঢাকার ভাষার নেতিবাচক প্রয়োগ বা এর কারণে লজ্জাবোধে এ ভাষার চর্চা কমে যাওয়ার কারণ বলে মনে করেন না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ। তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকার ভাষা অত্যন্ত রসাল ভাষা। এ ভাষার শব্দ সংগ্রহ আমাদের মূল্যবান সম্পদ। এর রক্ষণাবেক্ষণ হওয়া দরকার। তবে সবচেয়ে জরুরি, এর চর্চা হতে হবে।’
তবে পুরান ঢাকার ভাষা কি হারিয়ে যাবে? অধ্যাপক মামুদ বলেন, ‘এলাকায় স্থানীয় মানুষ কজন আছেন? ভাষা তো যোগাযোগের মাধ্যম। কেউ কথা বললে তো তার প্রত্যুত্তর পেতে হবে। তা যদি না হয়, ভাষার ব্যবহার তো কমবেই। হ্যাঁ, হারিয়ে যাওয়ারও শঙ্কা আছে।’