তরুণ শাহীন যেন 'উপকূল এক্সপ্রেস'

প্রলয় তাণ্ডব চালানোর পর কেবল শান্ত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। সাতক্ষীরার কয়রা উপজেলার কাটমারচর এমন একটি এলাকা, যেখানে চারদিকে পানি আর পানি। এমন পানিবন্দী জায়গার মাঝখানে একটি ঘর। ঘরটি ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। ঘরটি দেখে বোঝার উপায় নেই যে এখানে কেউ থাকতে পারে। তবু কৌতূহল মেটাতে সেখানে গিয়ে দেখা গেল, ঘরের মধ্যে ছয়-সাতজনের একটি পরিবার। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেখানে একজন গর্ভবতীও আছেন। তাঁর হাত–পা প্রচণ্ড ফোলা এবং খুবই অসুস্থ। যেকোনো সময় তাঁর প্রসববেদনা উঠতে পারে। এমন পানিবন্দী পরিবেশে আশপাশে ওই পরিবার ছাড়া অন্য কোনো মানুষ নেই। ধারে–কাছে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় এবং ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় ওই গর্ভবতীকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে যেতে পারেনি পরিবারটি।
এতক্ষণ আপনারা যে গর্ভবতী ও পানিবন্দী পরিবারটির ব্যাপারে পড়লেন, আজকের গল্পটি ওই নারী বা পরিবারকে নিয়ে নয়; বরং আজকের গল্পটি এমন অসংখ্য পরিবারের পাশে অসময়ে বন্ধু হয়ে দাঁড়ানো এক তরুণের। কাউকে অতিক্রম নয়, বরং ব্যতিক্রম কিছু করতে চাওয়া সেই তরুণের নাম এস এম শাহীন আলম।সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়ের এস এম শহিদুল্লাহ ও জাহানারা খানম দম্পতির সন্তান এস এম শাহীন আলম।
উপকূলীয় এলাকায় জন্মগ্রহণ করায় শাহীন খুব কাছ থেকে দেখেছেন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম। উপকূলের বেশির ভাগ মানুষের দিনের শুরু হয় পানির সঙ্গে। পানির সঙ্গে তাদের নিবিড় বন্ধুত্ব। এই পানি আর সুন্দরবন যে তাদের আয়ের প্রধানতম উৎস। তবে হতাশার বিষয় হচ্ছে, যেখানে চারদিকে পানি আর পানি, সেখানে নেই নিরাপদ খাওয়ার পানি।

সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ অসংখ্য সম্ভাবনাময় শিল্প যেখানে প্রতিনিয়ত হাতছানি দেয়, সেখানে নেই উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। আবার অভাবের তাড়নায় এলাকার শিশুদের ঝরে পড়া, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা, পুষ্টিকর খাবারের অভাব বরাবরই কাছ থেকে দেখেছেন শাহীন আলম। এ জন্য নিজের জন্মস্থান অবহেলিত এই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাবরই কিছু করতে চেয়েছেন তিনি।
তাঁর এই ইচ্ছা অনেক দিন আগের। ২০০৯ সালে যখন ঘূর্ণিঝড় আইলা উপকূল বিধ্বস্ত করে দিয়ে যায়, তখন শাহীনের বয়স মাত্র ৮ বছর। প্রকৃতিক দুর্যোগের পর উপকূলের মানুষ যে কতটা দুর্বিষহ জীবন যাপন করে, তা তিনি তখন খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
সে সময়ের কথা স্মরণ করে শাহীন আলম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলার সময় আমার বয়স মাত্র ৮ বছর। আইলা–পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন আমরা ঘরের মধ্যে মাচা করে তার ওপর থাকতাম। জোয়ারের সময় ঘরে পানি ঢুকত। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খাওয়ার কিছু ছিল না। আমাদের এই দ্বীপে যখনই কোনো ট্রলার আসত, আমি ছুটে যেতাম। ভাবতাম, এই বুঝি কেউ আমাদের জন্য কিছু নিয়ে এল। তিনি আরও বলেন, সে সময় সবচেয়ে কষ্টের বিষয় যেটা ছিল তা হলো, বিভিন্ন সময়ে ট্রলারে করে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসীর জন্য ত্রাণ নিয়ে আসত, কিন্তু এই ত্রাণের সবই থাকত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য। আমাদের শিশুদের জন্য আলাদা করে কেউ কিছু নিয়ে আসত না। বিষয়টি সব সময় আমাকে কষ্ট দিত। আমি তখন থেকেই ভাবতাম, উপকূলের অবহেলিত শিশুদের জন্য কিছু করা দরকার।’

অদম্য ইচ্ছা থাকলে সবকিছু না হলেও অনেক কিছু যে করা যায়, প্রতিনিয়ত তার প্রমাণ রেখে চলেছেন সদ্য যৌবনে পা রাখা এই তরুণ। ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুলের সময়ে দাঁড়িয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে। আর কয়েক দিন আগে প্রলয় তাণ্ডব চালিয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আগে থেকে এখনো পর্যন্ত নিরলস কাজ করে চলেছেন।
উপকূলের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাবার এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করেছেন। শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার এবং খেলনাসামগ্রী নিয়ে হাজির হয়েছেন। গর্ভবতীদের জন্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দিয়েছেন উপকূলের অবহেলিত কিশোরীদের কাছে। করোনার এই প্রাদুর্ভাবে মানুষকে সচেতন করতে বারবার সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের জন্য কাজ করেছেন। সচেতনতামূলক প্রচারপত্র বিলি করেছেন উপকূলের মানুষের মধ্যে।
শাহীনের সবচেয়ে শক্তির জায়গা তাঁর ফটোগ্রাফি। তাঁর প্রতিটি ছবিই যেন কথা বলে। শাহীন শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুবই সক্রিয়। সব সময় উপকূলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরেন ছবির মাধ্যমে। যেসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচরাচর গণমাধ্যমকর্মীরা যেতে পারেন না, সেসব জায়গাতে গিয়েও নিয়মিত ফেসবুক লাইভে এসে সবার কাছে তুলে ধরেছেন উপকূলের মানুষের কষ্টের কথা। মূলত তাঁর এই ছবি আর লাইভ দেখেই দেশ-বিদেশের অনেক বিত্তবান মানুষ ও সংগঠন উপকূলবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছে। এ রকম বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সহযোগিতায় শাহীন সাত লক্ষাধিক টাকার বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন উপকূলের মানুষের কাছে।

আত্মতৃপ্তির কথা উল্লেখ করে এস এম শাহীন আলম বলেন, ‘আমার এই ছোট্ট জীবনে আমি সব থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছি এই উপকূলে, আবার সবচেয়ে বেশি আনন্দও পেয়েছি এই উপকূলে। যখন ট্রলারে করে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই, অবহেলিত শিশুদের জন্য কিছু করতে পারি তখন যে ভালোলাগা কাজ করে, পৃথিবীর আর কোথাও সে ভালো লাগা খুঁজে পাইনি। উপকূলের শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে প্রাণটা ভরে যায়। নিজেকে সফল মনে হয়।’ শাহীন আলম শুধু উপকূলবাসীর জন্য কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন লেখাপড়া। বর্তমানে তিনি সাতক্ষীরা সরকারি কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে অধ্যায়নরত। লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশুকাল থেকেই যুক্ত আছেন সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সঙ্গে। ইউনিসেফেও শিশু সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। উপকূলের বিভিন্ন সমস্যা-সম্ভাবনার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন নিয়মিত।
তাঁর ছবি, ভিডিও নতুন করে উপকূলের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয়। উপকূলের মানুষ যে কতটা সংগ্রাম করে দিন কাটায়, তা মনে করিয়ে দেয়। সম্প্রতি শাহীন আলমকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে জার্মানভিত্তিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে।
আঠারো যে মাথা নোয়াবার নয়, তা বারবার প্রমাণ করে চলা শাহীন আলমের ইচ্ছা উপকূলের জন্য টেকসই কিছু করার। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হওয়া উপকূলবাসীকে যেন প্রতি দুর্যোগে ঘর ছেড়ে যেতে না হয়, অন্যের সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়, শিশুরা যেন ঝরে না পড়ে, তাদের ভবিষৎ যেন সুন্দর হয়, এমনটাই চাওয়া শাহীনের।