তাপে ফাটল, অতিবৃষ্টিতে আর্দ্রতা বাড়ছে প্রত্নস্থানে

ষাটগম্বুজ মসজিদের তিন দিকের অংশে সংস্কার করা স্থানে নোনা ধরেছে। মাটির লবণাক্ততা স্থাপনার উঁচু অংশে কীভাবে পৌঁছায়, তা গবেষণাসাপেক্ষ।

  • উপকূলের ২১ জেলায় প্রত্নস্থানের সংখ্যা ১২৮টি।

  • অন্তত ৫০টি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে।

  • উপকূলের স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন দরকার।

ষাটগম্বুজ মসজিদ
ফাইল ছবি

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমন নিদর্শন বা প্রত্নস্থানের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। এসব প্রত্নস্থানকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সুরক্ষার জন্য সরকারি দলিলেই কেবল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না।

এ অবস্থায় আজ সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ঐতিহ্য ও জলবায়ু’। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন

মনুমেন্ট অ্যান্ড সাইটসের (ইকোমস) প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৮২ সাল থেকে ইউনেসকো দিবসটি পালন করছে।

ষাটগম্বুজ মসজিদ

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় ৫২২টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি আছে। এর মধ্যে দেশের উপকূলের ২১ জেলায় প্রত্নস্থানের সংখ্যা ১২৮টি বলে অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি প্রত্নস্থান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতির মুখে বলে জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, জাতিসংঘের আন্তসরকার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলসহ (আইপিসিসি) একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একটি বিপন্ন এলাকা। ২০০৫ সাল থেকে প্রায়ই বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। বাড়ছে লবণাক্ততা।

বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ-পশ্চিমের ৮৩ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ত ছিল। ২০০৯ সালে তা ১০ লাখ ৫ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়।

এ লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণের ষাটগম্বুজ মসজিদসহ একাধিক প্রত্নস্থানে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক খন্দকার মাহফুজ উদ দারাইন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্নস্থানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন।

অধ্যাপক খন্দকার মাহফুজ উদ দারাইন বলেন, ষাটগম্বুজ মসজিদের উত্তর দিক ছাড়া বাকি তিন দিক এক দশক আগে বিশেষভাবে তৈরি ইট দিয়ে সংস্কার করা হয়। দেখা গেছে, সংস্কার করা এসব স্থানে নোনা ধরে গেছে। উত্তর দিকের পুরোনো অংশের চেয়ে নতুন ইট লাগানো অংশে নোনা ধরার হার বেশি।

এর বাইরে নয়গম্বুজ মসজিদ ও চুনাখোলা মসজিদেও নোনা ধরার হার বেশি দেখা গেছে। খন্দকার দারাইন আরও দুটি প্রবণতার কথা বলেন, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অনিবার্য প্রভাব বলে মনে করছেন তিনি। এর মধ্যে একটি হলো তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রত্নস্থানের একাধিক জায়গায় ফাটল বা চ্যুতির পরিমাণ বেড়ে গেছে।

খন্দকার দারাইন বলেন, গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রার পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রতিবছর বাড়ছে। ফলে দিনের বেশির ভাগ সময় ধরে তাপমাত্রার আধিক্যে এ ধরনের ফাটল বেশি দেখা যাচ্ছে। তাপ বেড়ে ফাটল ধরার পাশাপাশি বৃষ্টির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় এসব ফাটল দিয়ে পানি চুইয়ে ভেতরে ঢুকছে এবং আর্দ্রতা বেড়ে যাচ্ছে।

নতুন লাগানো বিশেষ ইটে নোনা ধরে যাওয়ার বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক আফরোজা খান বলেন, বিশেষভাবে তৈরি ইটগুলো হয়তো লবণাক্তসহিষ্ণু হিসেবে তৈরি করা হয়নি। কিন্তু শুধু দেয়ালে নয়, গম্বুজের চূড়ায়ও নোনা ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মাটির লবণাক্ততা এতটা উঁচুতে কীভাবে যেতে পারে, তা গবেষণাসাপেক্ষ। তবে ফাটলের সৃষ্টিতে অতিবৃষ্টি ও তাপ যথাযথ কারণ বলেই মনে হয়।

উৎকণ্ঠা আছে, উদ্যোগ নেই

ইকোমস, গুগল আর্টস অ্যান্ড কালচার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল ডকুমেন্টেশনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাইআর্ক ২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে একটি কর্মশালা করে। সেখানে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

সেগুলোর মধ্যে প্রথমটি ছিল প্রত্নস্থান, বিশেষ করে বিশ্ব ঐতিহ্য—এমন স্থানগুলো সংরক্ষণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া। অন্য প্রস্তাবগুলো হলো প্রত্ন আইন, ২০১৫–এর ধারায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ের নীতিমালায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শনগুলোর ত্রিমাত্রিক ডকুমেন্টেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে অধিদপ্তর ও এর মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালু করা।

এসব প্রস্তাব বাস্তবে কতটুকু কার্যকর হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত বলেন, ‘আমরা কিছু কিছু উদ্যোগ নিচ্ছি। আইনের সংস্কার করে পাঠানো হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করার পর আগামী অর্থবছরে কাজ করব।’

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বলছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের যে পদ্ধতি এখন চালু আছে, তার পরিবর্তন দরকার। কিন্তু জলবায়ুসহিষ্ণু করে প্রত্নস্থান সংরক্ষণের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তার বরাদ্দ নেই। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য সেই অর্থে বিশেষ ব্যবস্থারও কোনো উদ্যোগ নেই।