দীর্ঘদিন ধরে দখল, দূষণ ও অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে পাবনা জেলার নদ-নদীগুলো। বন্ধ হয়ে গেছে ৩০০ কিলোমিটার এলাকার ১৫টি নৌপথ। বিলুপ্ত হয়েছে ১৭টি নৌবন্দর। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প, অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। দখলমুক্ত করে নদীগুলো পুনঃখননের দাবি জেলাবাসীর দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জোরালো কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য বাতায়ন ও জেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে পদ্মা নদী, পূর্বে যমুনা ও উত্তরে রয়েছে বড়াল নদ। জেলা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতী। এ ছাড়া পাবনাকে আগলে রেখেছে আত্রাই, সুতি গাং, চন্দ্রাবতী, গুমানী, চিকনাই, সুতিখালি, কাগেশ্বরী, রুকনাই, বাড়নাই, ট্যাপাগাড়ি, গোহাল, শালিকা, শুটকিদহসহ আরও কিছু শাখা নদ-নদী ও খাল। স্বাধীনতার পরও এসব নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক ছিল। ফলে নৌপথের ওপর নির্ভর করেই সমৃদ্ধ হচ্ছিল জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও অর্থনীতি। কিন্তু দখল-দূষণ ও অবহেলায় নদ-নদীগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে জেলা সদরের বাজিদপুর, পাকশী, ঈশ্বরদীর সাড়াঘাট, স্থলচর, বেড়া উপজেলার নগরবাড়ি, কাজিরহাট, ভারেঙ্গা, নাকালিয়া, ভাঙ্গুড়ার বড়াল ব্রিজ ঘাট, চাটমোহরের নূরনগর ঘাট, বোথর ঘাট, পুরোনো বাজারসহ ১৭টি নৌবন্দর।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পাবনা জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৪০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে নৌযান চলাচল করত। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ৩০০ কিলোমিটারের ১৫টি নৌপথ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আংশিক চালু রয়েছে পদ্মা ও যমুনার কিছু পথ। তা-ও শুষ্ক মৌসুমে চর পড়ে মাঝেমধ্যেই নৌযান চালাচল বন্ধ থাকে।
পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় নদী শুকিয়ে জেগে ওঠা চরের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ হেক্টর; যার এক-তৃতীয়াংশই অবৈধ দখলে রয়েছে। এ ছাড়া ২০০৭ সালে ইছামতী নদীর দুই পাশে ২৮৫ জন অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করে একটি তালিকা তৈরি করে। কিন্তু এ পর্যন্ত তাদের উচ্ছেদ করা হয়নি।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাহবুবুল আলম জানান, ষাটের দশকে ইছামতী নদীকে কেন্দ্র করে পাবনায় হোসিয়ারি ও কাঁচিশিল্প বিস্তার লাভ করে। পাশাপাশি ঘুরে দাঁড়ায় তাঁতশিল্প। বড়াল নদের ওপর ভিত্তি করে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর সমৃদ্ধ হয় দুগ্ধশিল্পে। কিন্তু নদ-নদীগুলো বিলীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাবনা জেলা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার বলেন, দীর্ঘকাল ধরে এ দেশে নদীর পানিতেই চাষাবাদ হতো। নদীগুলো পনিশূন্য হয়ে পড়ায় বিকল্প সেচব্যবস্থা করতে হয়েছে। এতে শুধু সেচ খরচই বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া নদীতে পানি না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না।
মৎস্য সম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় প্রাকৃতিকভাবে দেশি মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ১৯৮২ সালে চলনবিল থেকে পাওয়া গিয়েছিল ৩৬ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন দেশি মাছ। বর্তমানে এই বিল থেকে পাওয়া যায় বছরে মাত্র চার হাজার মেট্রিক টন মাছ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পাবনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বর্তমান সরকার নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই পাবনার বড়াল নদকে সচল করতে বাঁধ ও জলকপাট অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য নদ-নদীগুলোও সচলের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পাবনার জেলা প্রশাসক রেখা রানী বালো বলেন, নদ-নদীগুলো দখলমুক্ত করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।