দোষ স্বীকার না করলেও সাজা দেওয়া যাবে
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাড়ছে। দোষ স্বীকার না করলেও ম্যাজিস্ট্রেট চাক্ষুষ ঘটনা, সাক্ষীদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচারেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিতে পারবেন। বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ আদালত কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলেই দণ্ড দিতে পারেন।
গতকাল সোমবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাড়িয়ে ‘মোবাইল কোর্ট (সংশোধন) আইন ২০১৫’-এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
অবশ্য নতুন সংশোধনীর অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করছেন আইনজীবীদের কেউ কেউ। আবার কেউ সংশোধনীর পক্ষেও বলছেন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়াকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি রিট করেছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। সেটির এখন শুনানি চলছে। জানতে চাইলে মনজিল মোরসেদ প্রথম আলোকে বলেন, নতুন সংশোধনী মাসদার হোসেন মামলার (এই মামলার আলোকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণ হয়) পরিপন্থী। সাক্ষী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচারে সাজা দেওয়ার বিধান যুক্ত করা মানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া। এটা কোনোভাবেই দেওয়ার সুযোগ নেই।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণ সম্পন্ন হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রমকে তাৎক্ষণিকভাবে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন করা হয়। সরকারের অধীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এই আদালতের ক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন জেলা প্রশাসক (জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) তথা প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। গত কয়েকটি জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এ দাবি তুলে ধরেন তাঁরা। ২০১৩ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে এ দাবিটি জোরালোভাবে ওঠে। পরে মন্ত্রিসভার এক সভায় আইনটি যুগোপযোগী করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়। গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনটির সংশোধিত খসড়া উপস্থাপন করলে মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরে সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সভার সিদ্ধান্ত জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কোনো ছবি, অডিও অথবা ভিডিও ক্লিপ সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট, অভিযুক্ত ব্যক্তি, সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপসহ বায়োমেট্রিকস (স্বতন্ত্র ব্যক্তির শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য) ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে পারবেন। এ বিষয়ে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘দুধে পানি মেশালে সেটা তো আর ম্যাজিস্ট্রেট পরীক্ষা করতে পারবেন না, সেখানে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন হবে। বর্তমানে যেমন বিএসটিআইয়ের প্রতিনিধি থাকেন।’
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কাজে আবশ্যিকভাবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক সদস্য নিয়োগ করতে বলা হয়েছে।
নতুন সংশোধনী বিচার বিভাগ পৃথক্করণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না, এটি রাজনৈতিকভাবে অপব্যবহার করা হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এটা দ্বন্দ্ব তৈরি করবে না, অপব্যবহারও হবে না। তিনি বলেন, ‘এতে আরও কার্যকরভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যাবে। আর এর সুফল পাবেন নাগরিকেরা।’
মন্ত্রিপরিষদ সূত্র জানায়, ২০১০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ৫ লাখ ৪০ হাজার ঘটনা নিষ্পত্তি হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায়। ভেজালবিরোধী অভিযান, বাল্যবিবাহ রোধ, ইভ টিজিং প্রতিরোধ, পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধসহ মোট ৯৩টি আইনের অধীন অপরাধ দমনে কাজ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নতুন সংশোধনীর বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘অসুবিধা কিছু দেখছি না। আমার তো মনে হয় অন্যায় কিছু হয়নি। অসুবিধা কোথায়?’
তবে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করা মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেটা করতে না দেওয়া মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে বিচার সামরিক শাসনের সময় করা হতো। গণতন্ত্রের এই যুগে এটা সাংঘাতিক আশ্চর্য লাগে। সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে অতীতের সামরিক শাসনের কলাকৌশল প্রয়োগ করছে। এর যৌক্তিকতা নেই।’
সাবেক আইনজীবী শফিক আহমেদ নতুন সংশোধনের পক্ষে। আর এ বিষয়ে স্টাডি না করে কথা বলতে রাজি হননি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আমীর-উল ইসলাম।
গতকালের সভায় বাংলাদেশ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ আইন ২০১৫-এর খসড়া ও পাট আইন ২০১৫-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
সভায় ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই ওয়ানডে ক্রিকেটের সিরিজ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, কোচ, ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানানো হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী সবাইকে পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা জানান। জাতীয় তথ্যবাতায়নের জন্য ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি যে পুরস্কার দিয়েছে তা গতকাল প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পুরস্কারটি দেশের মানুষকে উৎসর্গ করেন।